নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই নির্দেশনা একটু দেরিতে হলো। রমজানের আগে এই নির্দেশনা এলে ভালো হতো বলে যারা ভাবছেন, তাদের মনে থাকা জরুরি যে, অতীতে প্রতি বছরই এ রকম নির্দেশনার খবর পেয়েছি, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। এবার ১৬ রমজানে এই নির্দেশনাও যে কাজ দেবে এমনটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। ইতিমধ্যেই ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে নানারকম পণ্য এলেও তা দামের কারণে সাধারণ ক্রেতা/ভোক্তাদের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীদের, যারা বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তারা যে সাধ্যমতো সেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েননি, তা নয়। বাজার মনিটরিং করে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তারাও তৎপর, কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও, তা গরিবদের কেনার সামর্থ্যরে বাইরেই রয়ে গেছে। একেবারে হতদরিদ্র, নিম্ন আয়ের শ্রমিক-মজুর শ্রেণির মানুষ ওপেন মার্কেট সেলের টিসিবির ট্রাক থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার চেষ্টা করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায়, এ নিয়ে লাইনে থাকা লোকদের ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কির ফলে বঞ্চিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে অনেকে। টিসিবি কেন ট্রাকের সংখ্যা বাড়ায় না, কেন লোকবল বাড়িয়ে চাহিদা মোতাবেক পণ্য সরবরাহ দেয় না, সে নিয়েও প্রশ্ন আছে। কম করে দেওয়ার নীতি যে বঞ্চিত করার শামিল সেটা তাদের বুঝতে হবে। আবার শৃঙ্খলার একটি সহজ ব্যবস্থা করতে পারে, আগে এলে আগে টোকেন পাবে এবং সেই মোতাবেক পণ্য বিক্রি করবে। এই সামান্য শ্রম বিনিয়োগ করা হলেই প্রান্তিক হতদরিদ্রদের সেবা সুনিশ্চিত করা যায়।
নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষেরা ওএমএসের লাইনে যেতে পারে না বা যায় না। তারা কিন্তু সবচেয়ে সংকটের মধ্যে পড়ে আছে। এটা শুধু ঢাকা মহানগরের সংকট না, দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হতদরিদ্র, নিম্ন আয়ের গরিবদের সমস্যা-সংকট একই রকম। তারাই মূলত কাঁচা শাকসবজি, তরিতরকারির উৎপাদক। সেই শ্রমজীবীদের বিষয়ে ভাবতে হবে। সরকার অবশ্য তাদের কথা ভেবেই কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। সেই সঙ্গে ওই সব মানুষ যাতে কাজ করার সুযোগ পায়, তার জন্য অচিরেই সরকার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা করবে। সেই সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে এলাকাভিত্তিক খাল খননের প্রোগ্রাম নিয়েছে, যাতে তারা বেকার না থাকে। গ্রামের প্রতিটি বাড়িকে যদি পণ্য উৎপাদনের উৎসে পরিণত করা যায়, তাহলে কোনো গরিবই আর অর্থকষ্টে ভুগবে না। সেসব পণ্যের মধ্যে ছোট আকারের দুগ্ধ উৎপাদনের খামার করা যেতে পারে। আমাদের পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় দুধ প্রয়োজন, যার ঘাটতি রয়েছে। কোনো গরিব মানুষ যাতে মহানগরে না আসে, তার জন্য গ্রামকেন্দ্রিক ছোট ছোট প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। দেশি হাঁস-মুরগি, ছাগল লালন-পালনের পাশাপাশি, মাংস উৎপাদনের জন্য খামার করা যেতে পারে। সেসব প্রাণিজ পণ্যের ব্যবসা ও পণ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ গ্রামের সার্বিক চাহিদা পূরণ করে বাড়তি উৎপাদন শহরে, নগরে, মহানগরে সরবরাহের চেইন তৈরি করা গেলে হতদরিদ্ররা সংসার ছেড়ে এসে বস্তিতে আশ্রয় নেবে না। পেটের দায়ে যারা মহানগরের বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের গ্রামে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
বাজারে পণমূল্য নিম্ন আয়ের লোকের জন্য সহনশীল করতে হলে, মহাজন-আড়তদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। সংসদে ব্যবসায়ী কোটিপতিদের সংখ্যা কম নয়। তাদের মধ্যে কি কোনো আড়তদার, মজুদদার বা সিন্ডিকেটওয়ালা নেই? সরকারকে তাদের চিনতে হবে। এদের বাইরেও আছে লোকাল সিন্ডিকেট। তাদেরও চিনতে হবে। ভাঙতে হবে এসব সিন্ডিকেট কারখানা। না হলে বাজার স্থিতিশীল করা যাবে না। মহানগরের কাঁচাবাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাম উন্নয়নই হতে পারে সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ।