নেপালের সাধারণ নির্বাচনে প্রাথমিক ভোট গণনায় বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে র্যাপার থেকে রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়া বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)। জেন-জিদের তীব্র আন্দোলনের মুখে কেপি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পতনের পর এটিই দেশটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচন। সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত গণনাকৃত ৫৭টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে আরএসপি ইতিমধ্যে তিনটি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও ৪৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। নির্বাচনের এই দৌড়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী অলির দল সিপিএন (ইউএমএল) বর্তমানে পাঁচটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। গগন থাপার নেতৃত্বাধীন নেপালি কংগ্রেস চারটি আসনে এগিয়ে থেকে তৃতীয় অবস্থানে আছে। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচন্ড’-এর নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি দুটি এবং রাজতন্ত্রপন্থি রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। আরএসপি সূত্র দাবি করেছে, তারা কাঠমান্ডু-১, কাঠমান্ডু-৭ এবং কাঠমান্ডু-৮ আসনে জয়লাভ করেছে। তবে নেপালের নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব আসনের ফল ঘোষণা করেনি। দলীয় সূত্রের তথ্যমতে, কাঠমান্ডু-৮ আসন থেকে বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠা, কাঠমান্ডু-১ থেকে রঞ্জু দর্শনা এবং কাঠমান্ডু-৭ আসন থেকে গণেশ পারজুলি জয়ী হয়েছেন।
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছেন। তিনি দেশ জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। বালেন্দ্র কাঠমান্ডু নগরের সাবেক মেয়র ছিলেন। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার রাত বা শনিবারের মধ্যে নির্বাচনের ফল পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নেপালের সংসদের নিম্নকক্ষের ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৬৫টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হচ্ছে। এখন সেগুলোরই গণনা চলছে। সংসদের বাকি ১১০ আসন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্ধারিত হবে। বালেন্দ্র নির্বাচনী প্রচারের সময় বিশাল জনসমাগম করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরাসরি জনসংযোগের মাধ্যমে পরিবর্তনপ্রত্যাশী তরুণ ভোটারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রেখেছেন। এমনকি ভারত সীমান্তবর্তী ঝাপা-৫ আসনে অলির (৭৪) নিজের ঘাঁটিতেও তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন শাহ। চীন ও ভারতের মাঝামাঝি অবস্থিত তিন কোটি মানুষের এই দেশে কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এর ফলে দেশটির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেকারত্ব বেড়েছে, যার মূলে রয়েছে কাঠামোগত সমস্যা ও ব্যাপক দুর্নীতি। দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গত সেপ্টেম্বরে। রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার তরুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার জেরে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তবে জেন-জি আন্দোলনের পর গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটের হার কমেছে। দেশটির মোট ভোটারের মাত্র ৫৮ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট দিয়েছে বলে জানিয়েছে নেপালের নির্বাচন কমিশন। অথচ ২০০৮ সালের সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২২ সালের নির্বাচন পর্যন্ত নেপালে ভোটদানের গড় হার ছিল ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ, বলছে কাঠমান্ডু পোস্ট। গত তিন দশকে কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট, ইউএমএল), নেপালি কংগ্রেস ও নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি-ই দেশটির মধ্যেই ক্ষমতার পালাবদল দেখা গেছে। এবার তাতে ছেদ ঘটার সম্ভাবনা যে প্রবল, ভোটের প্রাথমিক গণনার ফলেই তা বোঝা যাচ্ছে।