লবণ-পানিতে ধ্বংস হচ্ছে সড়ক

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন পিচঢালা সড়ক লবণবাহী ট্রাকের কারণে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণ পরিবহনের সময় ট্রাক থেকে রাস্তায় পড়া নোনাজল ধীরে ধীরে পিচের আস্তরণ নষ্ট করে দিচ্ছে। এতে সড়কে তৈরি হচ্ছে গর্ত ও ভাঙন। পাশাপাশি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সড়কের স্থায়িত্ব। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহন চালকদের ভোগান্তি বাড়ছে।

পেকুয়া-কুতুবদিয়া উপজেলার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বানৌজা সাব মেরিন সড়ক। পেকুয়া বাজার ও চৌমুহনী এলাকায় যানজটে আটকে পড়লে লবণ বোঝাই ট্রাক থেকে পড়া নোনা পানিতে সড়কের বিটুমিন গলে পিচ উঠে যায়। উজানটিয়া করিম দাদ মিয়ার ঘাট থেকে কাটা ফাঁড়ি সড়ক, মালেক পাড়া থেকে সোনালি বাজার সড়কের পিচও উঠে যাচ্ছে।

রাজাখালী মগনামার প্রধান ও অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো লবণবাহী ট্রাক থেকে পড়া পানিতে ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সড়কের এই ভয়াবহ দশা নিয়ে কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, মগনামা ও রাজাখালী মাঠ থেকে লবণ তুলে রাস্তার পাশেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এসব স্তূপ ঢাকার জন্য লোকদেখানো পাতলা পলিথিন ব্যবহার করা হলেও লবণের বড় একটি অংশ রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। মূলত এসব পয়েন্ট থেকেই ছোট ডাম্পারে লবণ তুলে বড় ট্রাকের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে বানৌজা সাবমেরিন সড়কের মগনামা অংশে। মগনামার বিভিন্ন পয়েন্টে বড় ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে থাকে এবং সেখানেই ছোট ডাম্পার থেকে লবণ ট্রাকে তোলা হয়। এই লোডিং প্রক্রিয়ায় মানসম্মত কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। লবণ থেকে পড়া পানি আর ছড়িয়ে পড়া লবণে পুরো সড়ক একাকার হয়ে আছে। একই চিত্র দেখা গেছে রাজখালী সড়কেও। সেখানে বড় ট্রাক ঢোকার সুযোগ থাকায় রাস্তার ওপরই সরাসরি চলে লোডিং। পাতলা পলিথিনের আস্তরণ ভেদ করে লোনাপানি সরাসরি পিচঢালা পথে মিশে যাচ্ছে।

মগনামা থেকে লবণবোঝাই করার পর ট্রাকগুলো যখন বরইতলী রাস্তার মাথা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেয় তখন বিপদ আরও ঘনীভূত হয়। লবণ সঠিকভাবে পানিনিরোধক ট্রিপল বা মোটা পলিথিন দিয়ে ঢাকা না থাকায় চলন্ত ট্রাক থেকে অনবরত লোনা পানি চুইয়ে সড়কে পড়তে থাকে। এই লবণ পানি পিচঢালা সড়কের বিটুমিন স্তরকে যেমন আলগা করে দিচ্ছে তেমনি রাস্তা জুড়ে একটি পিচ্ছিল আস্তরণ তৈরি করছে। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী অন্যান্য যানবাহনের চাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ছোট গাড়িগুলো ব্রেক করলেই উল্টে যাচ্ছে।

গোঁয়াখালী এলাকার বাসিন্দা মো. মুজাহিদ বলেন, ‘এ সড়কে প্রায় প্রতি মাসে ১৫-২০টি দুর্ঘটনা ঘটে। গতকালও একটি অটোরিকশা উল্টে গেছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি।’ পেকুয়া বাজারের ব্যবসায়ী রিয়াজুদ্দিন বলেন, ‘মগনামা থেকে বাঁশখালী ও বরইতলী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথ এখন লবণের লোনা পানির কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।’

কক্সবাজারের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাহাত আলম বলেন, ‘লবণ পানি বিটুমিনের আঠালোভাব দ্রুত নষ্ট করে ফেলে। ফলে পাথরগুলো আলগা হয়ে যায়। তখন ভারী যানবাহনের চাপে রাস্তা দ্রুত ভেঙে পড়ে। হালকা কুয়াশায় মাটি-বালি এই লবণ পানিতে মিশে রাস্তা সাবানের মতো পিচ্ছিল হয়ে যায়। এর ফলে মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ছে।’ রাহাত আলম আরও বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে পেকুয়ার গোঁয়াখালী, রাজাখালী ও মগনামা সড়কে অন্তত ডজনখানেক ছোট-বড় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।’

স্থানীয়রা মনে করছেন, লবণশিল্প এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ হলেও সড়ক অবকাঠামো রক্ষা করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে তা বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হবে। পেকুয়া সদরের দিদারুল আলম নামে একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘রাস্তাটা আমাদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। কিন্তু লবণের গাড়ির কারণে রাস্তাটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।’

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। সরকারি সম্পদের ক্ষতি করে ব্যবসা করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আমরা দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা ও জরিমানা নিশ্চিত করব।’

কক্সবাজার সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) মহোদয়কে জানিয়েছি। এরপর ডিসি মহোদয় পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে লবণ ব্যবসায়ীরা এই নির্দেশনা তোয়াক্কাই করছেন না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত