কৃষি মৎস্য চাষ পরিবেশ সুরক্ষা

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

কৃষি বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের সিংহভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি অর্থনীতির মূলভিত্তি। কৃষি শিল্পের কাঁচামাল জোগায়।  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সিংহভাগ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে কৃষির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। এক সময় আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চ ফলনশীল জাত ফসলের বীজের উদ্ভাবন হয়নি কৃষিতে। তখন সেচ যন্ত্রের ব্যবহার ছিল সীমিত। ট্রাক্টর-পাওয়ার ট্রিলারের ব্যবহার ছিল না। কৃষক গরু-মহিষচালিত লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করত। একরপ্রতি ফলন ছিল অত্যন্ত কম। শাকসবজি ও ফলমূলের প্রাচুর্র্য ছিল না। গ্রীষ্মকালে মিষ্টি লাউ, শোলাকচু, ঝিঙা, পটল, ডাটা, ঢেঁড়স, চালকুমড়া, চিচিঙ্গা ছাড়া তেমন সবজির দেখা পাওয়া যেত না। জমির আইল, বসতবাড়ির আশপাশের কচু শাকই ছিল দরিদ্র মানুষের সবজির বড় উৎস। তবে শীতকালে পাওয়া যেত  বেশিরভাগ সুস্বাদ সবজি। প্রাইভেট বীজ কোম্পানিগুলোর গবেষণা ও অদম্য চেষ্টার ফলে এখন গ্রীষ্ম আর বর্ষা নেই। বছর জুড়ে প্রায় সব রকম সবজি দেখা যায়। সবজি চাষের অনেক সুবিধা। যেমন ১. অল্প জমিতে চাষ করা যায়, দাম বেশি। ২. বাজারে চাহিদা প্রচুর। ৩. দানা ফসলের চেয়ে লাভ বেশি। ৪. দৈনন্দিন পারিবারিক প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে অতিরিক্ত অর্থ আয় করা যায়। ৫. বিনামূল্যে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিতরণ করা যায়। ৬. বসতবাড়ির আশপাশ জমির আইলের ধার এবং ছাদেও সবজির চাষ করা যায় এবং ৮. সবজি সব ভিটামিনও খনিজের উৎস ও রোগীর পথ্য।

কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল জাত ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম ও বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোর হাইব্রিড বীজ উদ্ভাবন এবং কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে বর্তমানে কৃষিতে ঘটেছে এক নীরব বিপ্লব। এর নায়ক হলো দেশের পরিশ্রমী কৃষক। এই বিপ্লবে দেশের উপজেলা, জেলা ও রাজধানী ঢাকা শহরে সবজি মেলা, ফলমেলা, বৃক্ষমেলার অবদান কম নয়। এ ছাড়া সবজি-ফলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিদেশি কিছু সবজি ও ফলের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনে বিশ্বে বাংলাদেশ প্রথম। ধান উৎপাদনে দ্বিতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, রপ্তানিতে প্রথম, আম উৎপাদনে সপ্তম, আলু উৎপাদনে অষ্টম, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম। বর্তমানে দেশে তিন মৌসুমে প্রায় ৪ কোটি টন চাল উৎপাদিত হচ্ছে। ২ কোটি টন সবজি ও সমপরিমাণ ফল উৎপাদন হচ্ছে। মাছ, মাংস ও ডিম দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি উৎপাদিত হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৭ থেকে১৯৮০ সাল পর্যন্ত কৃষি, মৎস্য উন্নয়ন, সুপেয় পানির সহজলভ্যতা বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জনগণের অংশগ্রহণে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খালকাটা প্রকল্প চালু হয়। ওই সময় মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়। যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫৩৬ মাইল। এর মাধ্যমে লক্ষাধিক একর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননের ফলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বোরোসহ রবি ফসলের ফলন বৃদ্ধি সম্ভব হয়।

বাংলাদেশে রয়েছে নদী-নালা, খাল-বিলসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক জলাশয়। এক শ্রেণির বিবেকবিহীন মানুষ এসব খাল-বিল ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করে মাছ ও জলজ প্রাণী ধ্বংস করে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করছে। আর এক শ্রেণির মানুষ তরল শিল্পবর্জ্য পরিশোধন না করে, সরাসরি নদী-নালা, খাল-বিলে ফেলে পরিবেশ ও বাস্তুতন্তের সর্বনাশ করছেন। এ কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে সুস্বাদু দেশি মাছ অদৃশ্য হয়ে গেছে। এখন আর খাল-বিলে আইর, বোয়াল, শোল, গজার, মেনি, রুই, কাতলা মাছের দেখা মিলছে না। দূষিত পানি পার্শ¦বর্তী কৃষিজমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করছে। খাল-বিল ভরাটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে চলে যাচ্ছ। সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যে নয়টি প্রতিশ্রুতি ছিল, তার মধ্যে খাল খনন অন্যতম। সরকার গঠন করলে ৫ বছরে দলটি ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করবে বলে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার গঠনের প্রথম পাইলটিং কর্মসূচির আওতায় ১৮০ দিনের মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার খাল খননের কথা জানিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০১৬ সালের ঢাকা প্রশাসনের সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে মোট ৫৮টি খালের মধ্যে ৩৭ খালই দখল হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে মাননীয় হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ও কার্যকর হচ্ছে না কোনো অদৃশ্য কারণে, তা জানা নেই। শুধু খাল খনন করলে চলবে না, খননকৃত খালগুলো সংরক্ষণে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। খালে কোনো অবস্থাতেই পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালী ও মেডিকেল বর্জ্য ফেলা যাবে না। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইটিপি ব্যবহার না করে সরাসরি তরল বর্জ্য নিক্ষেপ করলে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। খালের পাড় কেটে কেউ যেন বোরো ধান বা পানি কচুর চাষ করতে না পারে, সে ব্যাপারে ইউনিয়ন পর্যায়ে সহকারী ভূমি কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়াতে হবে এবং মাসিক সভায় এসিল্যান্ডের অফিসকে অবহিত করতে হবে।

হাইকোর্টর ঐতিহাসিক রায় অনুসারে, খাল দখল ও দূষণকারীরা স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রাকৃতিক জলাশয়ের উপকারিতা এবং সংরক্ষণের উপায় নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সভা করতে হবে। খাল দখল ও দূষণকারীকে কোনো সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ দেওয়া যাবে না এবং খাল দখল ও দূষণকারীর তালিকা স্থানীয় প্রতিষ্ঠনের মাধ্যমে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস খাল খননের সঙ্গে এসব কর্মসূচিকে দেশের কল্যাণকর কাজে লাগিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত