অমর একুশে বইমেলায় দর্শনার্থীদের বড় একটি অংশ নারী হলেও নারীকেন্দ্রিক নতুন বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। তবু মেলায় আসা নারী-পুরুষ পাঠকরা বিভিন্ন স্টল ঘুরে এসব বই খুঁজে নিচ্ছেন। নতুন প্রকাশনার পাশাপাশি পুরনো নারীবিষয়ক বইয়ের প্রতিও আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে পাঠকদের। গতকাল রবিবার মেলার বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টল ঘুরে দেখা যায়, নারী লেখকদের নতুন বই ও নারীকেন্দ্রিক নানা বিষয়ভিত্তিক বই নিয়ে পাঠকের আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের মধ্যে এসব বই নিয়ে কৌতূহল লক্ষ করা গেছে।
বইমেলার ‘একুশে প্রকাশন’-এর স্টলে এ বছর কয়েকজন নারী লেখকের নতুন বই রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পলি শাহীনার ‘না জীবন না মৃত্যু’, তাসলিমা জামান পান্নার ‘কাছে থেকেও দূরে তুমি’, পিওনা আফরোজের ‘বিকেলের অনেক রং’ এবং রিমি রুম্মানের ‘নোঙর’ বইগুলো পাঠকের নজরে এসেছে।
প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী রাশেদুল ইসলাম বলেন, নারী লেখকদের বই নিয়ে পাঠকের আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে নারী পাঠকরা এসব বই খুঁজে দেখছেন এবং অনেকেই কিনছেন।
অন্যদিকে, অয়ন প্রকাশনী থেকে এ বছর এসেছে শর্মি দে-র কবিতার বই ‘একটি বিষণœ বেহালা’। পাশাপাশি গবেষণামূলক বইয়ের মধ্যে চন্দন চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বাংলা বিজ্ঞাপনে নারী’ বইটিও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
প্রকাশনীর প্রতিনিধি সুমন সরকার বলেন, গবেষণাধর্মী নারীকেন্দ্রিক বইও পাঠকের আগ্রহ পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইটির চাহিদা বেশি।
সময় প্রকাশনের স্টলেও নারীকেন্দ্রিক বেশ কিছু বই রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মিশু চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের অভিযাত্রা’ এবং হাসান মোরশেদের ‘নারী সাক্ষ্যে জেনোসাইড’ বই দুটি ভালো বিক্রি হচ্ছে বলে জানান স্টল ব্যবস্থাপক মাহবুব আলম। তিনি বলেন, সমসাময়িক নানা আলোচনার কারণে নারীকেন্দ্রিক গবেষণামূলক বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়ছে। তবে সব প্রকাশনীর চিত্র একই রকম নয়। অনিন্দ্য প্রকাশনের স্টলে গিয়ে দেখা যায়, নকুন বইয়ের তুলনায় পুরনো বইয়ের বিক্রিই বেশি। বিশেষ করে আনোয়ার পাশার ‘নীড় সন্ধানী’, ‘ওঙ্কর’ এবং ‘নিরুপায় হরিণী’ বইগুলো পাঠকরা বেশি খুঁজছেন।
প্রকাশনীর বিপণন কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান বলেন, এ বছর নারীকেন্দ্রিক নতুন বই খুব বেশি প্রকাশ হয়নি। ফলে পাঠকরা আগের প্রকাশিত বইয়ের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
অন্যদিকে অন্বেষা প্রকাশনের স্টলেও নারীকেন্দ্রিক বইয়ের বিক্রি লক্ষ করা গেছে। সেখানে তসলিমা নাসরীনের ‘পঞ্চ নারী’ বইটির পাশাপাশি এ বছর প্রকাশিত ড. নাজমুন নাহারের ‘আমি এক বিচিত্র শিল্পকর্ম অবাধ্য নারী’ বইটিও পাঠকের আগ্রহ পাচ্ছে বলে জানান স্টল কর্মীরা।
মেলায় ঘুরতে আসা পাঠকদের মধ্যেও নারী লেখকদের বই নিয়ে আগ্রহের কথা শোনা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া রহমান বলেন, নারী লেখকদের লেখা পড়তে ভালো লাগে। তারা অনেক সময় নারীদের বাস্তব জীবন, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরেন, যা পাঠকের সঙ্গে সহজেই সম্পর্ক তৈরি করে।
রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা তানভীর হাসান বলেন, আগে নারী লেখকদের বই খুব একটা পড়া হয়নি। কিন্তু এখন দেখছি সমাজ, অধিকার ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা বিষয় তারা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন, যা পড়তে আগ্রহ জাগায়।
রবিবার মেলা প্রাঙ্গণেও নারী দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার, বন্ধু বা সহপাঠীদের সঙ্গে মেলায় এসে অনেক নারী পাঠক নিজেদের পছন্দের বই খুঁজে নিচ্ছেন। তবে প্রকাশকদের মতে, নারীকেন্দ্রিক নতুন বইয়ের সংখ্যা এখনো তুলনামূলক কম। তারা আশা করছেন, আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং পাঠক আগ্রহও বাড়বে।
বইমেলায় এসেছে ৭৫টি বই
গতকাল ৮ মার্চ ছিল অমর একুশে বইমেলার ১১তম দিন। এদিন বইমেলা দুপুর ২টায় শুরু হয়ে রাত ৯টায় শেষ হয়। তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ৭৫টি। এর মধ্যে মেলায় এসেছে বাতিঘর থেকে মোস্তাক শরীফের অনুবাদ গ্রন্থ ‘আফটার ডার্ক, স্বপ্ন ’৭১ থেকে সাহাদাত পারভেজের ‘ভাষা আন্দোলন’, পাঞ্জেরী থেকে জোহরা শিউলীর ‘পরিবন্ধু’।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আসাদ চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আজিজুল হক।
কুদরত-ই-হুদা বলেন, কবি আসাদ চৌধুরীর কবিতায় সবসময়ই সক্রিয় থেকেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি অপরিসীম দরদ। তার যাপন আর কবিতার মধ্যে ছিল একটা খাঁটি পূর্ববঙ্গীয় ব্যাপার। তাকে বাংলাদেশের ভাষা, সাংস্কৃতিক ইতিহাস আর নিজস্ব কাব্যপ্রগতির সঙ্গে সহজেই মিলিয়ে পাঠ করা যায়। এই বিষয়টিই আসাদ চৌধুরীকে তার কালের কবিদের থেকে আলাদা করেছে বলে ধারণা করা যায়। এই ঘরানাটি বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে বরাবরই ক্ষীণ। এই ধারার ভেতর দিয়েই প্রকাশ পেতে পারে ‘আমাদের আধুনিকতা’র খাঁটি রূপটি।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি, গবেষক, সাংবাদিক মাহবুব হাসান।
বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন রহিমা আখতার কল্পনা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আলো আরজুমান বানু, ফারজানা এ্যালি। সংগীত পরিবেশন করেন কল্যাণী ঘোষ, মোসা. নিপা আক্তার, জাকিয়া সুলতানা স্বর্ণলতা, আরিমা তাবাসসুম, সাধিকা সৃজনী তানিয়া, দিপু সমাদ্দার, মমতা দাসী এবং তাপসী রায়।
আজকের সময়সূচি
আজ ৯ মার্চ সোমবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শহীদুল্লা কায়সার শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শিবলী আজাদ। আলোচনায় অংশ নেবেন প্রশান্ত মৃধা। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।