সরকারি জমি বন্ধক রেখে ঋণ জালিয়াতি বেক্সিমকোর

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৪৮১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো)। কিন্তু এ ঋণ নিতে যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি। এমনকি ঋণের বিপরীতে সরকারি অধিগ্রহণ করা জমি বন্ধক রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার লঙ্ঘন করে ঋণ পুনর্গঠন ও মঞ্জুরিপত্রের শর্তানুযায়ী জামানত গ্রহণ না করায় এ অর্থ আদায় করা ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অগ্রণী ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আর্থিক হিসাব ও ঋণের হিসাব বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ জুন অগ্রণী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের গ্রাহক বেক্সিমকোর নামে ৪৮১ কোটি ৬১ লাখ টাকার ডিমান্ড লোন ও টার্ন লোনের দায় দ্বিতীয়বার পুনর্বিবেচনার করে পুনর্গঠন প্রস্তাব মঞ্জুর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার অনুযায়ী ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার প্রতিটি বিজনেস কনসার্নের করপোরেট গ্যারান্টি না নিয়েই প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ওই মঞ্জুরিপত্রে পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত শর্তানুযায়ী জামানতের বিষয়টি পরিপালন না করায় ঋণ আদায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারির বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার-৪ অনুযায়ী ঋণের ক্ষেত্রে করপোরেট গ্যারন্টি নেওয়া হয়নি এবং শাখা থেকে জামানত বাড়ানোর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী জামানত হিসেবে বন্ধকীকৃত জমি সরকারি অধিগ্রহণকৃত, তাই ওই সম্পত্তির অধিগ্রহণ অবমুক্তির সরকারি গেজেট গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়, সেটিও মানা হয়নি। ব্যাংকটির প্রধান শাখার এবং বেক্সিমকোর কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশ করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত শর্তানুযায়ী জামানত আদায় না করে এ পরিমাণ ঋণ দেয়।

অগ্রণী ব্যাংক প্রধান শাখার গ্রাহক বেক্সিমকোর ঋণ পুনর্গঠনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন গ্রহণ, ঋণ পুনর্গঠনে পর্যাপ্ত জামানত গ্রহণ এবং জামানত হিসেবে বন্ধক দেওয়া জমি সরকারি অধিগ্রহণকৃত হওয়ায় ওই সম্পত্তির অধিগ্রহণ অবমুক্তির সরকারি গেজেট গ্রহণের জন্য ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রধান শাখার মহাব্যবস্থাপককে চিঠি দেওয়া হয়।

ব্যাংকের কোম্পানি সচিব খন্দকার সাজেদুল হক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখার গ্রাহক বেক্সিমকোর অনুকূলে ২২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার ডিমান্ড লোনের স্থিতি পরিশোধের মেয়াদ ৬ থেকে ১২ বছর বৃদ্ধি এবং ২৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার টার্ম লোনের স্থিতি পরিশোধের মেয়াদ ৯ থেকে ১২ বছর বৃদ্ধি করে ৪৮১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ৩১টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধের বিবেচনার জন্য ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৬৪৩তম সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও অডিট কমিটির সুপারিশের আলোকে পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকটির প্রধান শাখার গ্রাহক বেক্সিমকো অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া ঋণ কয়েকটি শর্তে দ্বিতীয়বার অনুমোদন করা হলো।

সভায় সিদ্ধান্ত হয় ঋণ ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেক্সিমকোর অনুকূলে দেওয়া ডিমান্ড লোনের স্থিতি ২২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধের বিদ্যমান মেয়াদ ৬ থেকে ১২ বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত পালন করতে হবে।

শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে বন্ধক দেওয়া জমি সরকারি অধিগ্রহণকৃত, ওই জমির অধিগ্রহণ অবমুক্তির গেজেট গ্রহণ করতে হবে। এরপরের শর্ত যথাক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রদত্ত ঋণ সুবিধা কার্যকর হবে; সব পরিচালকের ব্যক্তিগত জামিননামা গ্রহণ করতে হবে; গ্রাহকের কাছ থেকে কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত সহায়ক জামানত গ্রহণ করতে হবে; দুটি ত্রৈমাসিক কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা বাতিল গণ্য হবে।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দ্বিতীয়বার ঋণ অনুমোদনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো) ঋণ উত্তোলন করে, যা ফেরত না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বেক্সিমকো গ্রুপ দেশের ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকার বেশির ঋণ নিয়েছে। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টে দাখিল করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আইনজীবী মুনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, বেক্সিমকোর কোম্পানিগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাসঙ্গিক আইন, নিয়ম, রীতিনীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংক দিয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপের ১৮৮টি কোম্পানির মধ্যে ৭৮টি কোম্পানি জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক এবং রূপালী ব্যাংকসহ ১৬টি ব্যাংক এবং অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স, আইডিএলসি ফাইন্যান্স এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত