ছেলেটা আমার কাছ থেকে অনাহারেই চলে গেল। আমার বুকের ধনটা সন্ত্রাসীরা কেড়ে নিল। তার সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। কোনো ঝগড়া-বিবাদ ছিল না। কেন আমার ছেলেকে কেড়ে নিল। ছেলের রক্তে শহীদ মিনার লাল করেছে সন্ত্রাসীরা। সরকারের কাছে ছেলে হত্যার কঠিন বিচার চাই বলতে বলতে বিলাপ করছিলেন নিহত রাকিবুল ইসলামের মা রাজিয়া বেগম। পাশেই বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার স্ত্রী হাবিবা আক্তার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় চাকরি করি। সেখানেই ছেলেকে ভর্তি করিয়েছি। রাকিব সেখানে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছিল। ২০২১ সালে বিয়ে করে। সে তার স্ত্রীর সঙ্গে থাকে।’
গত রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদির সামনে রাকিবকে গুলি করে ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। ঘটনার পর কয়েকজন পথচারী তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিলেও বাঁচানো যায়নি। গতকাল সোমবার ঢামেক হাসপাতাল মর্গের সামনে গিয়ে সরেজমিনে এমন আহাজারির চিত্র দেখা যায়। নিহত রাকিবের মা ও স্ত্রীকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজনরা। কিন্তু একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় রাজিয়া।
রাজিয়া বেগম বলেন, ‘শনিবার সাহরি খেতে না পারায় রোজাও রাখেনি। দুপুরে এসে আমার কাছে এসে ভাত খেয়েছে। এরপর বিকেলে আবার ভাত খেতে আসে। এ সময় বলি, বাবা একটু বসো রান্না করে দিচ্ছি। তখন না খেয়ে রাগ করে বেরিয়ে যায়। তার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলি, মা, রাকিব রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছে। তুই একটু ভাত দিস ওরে। তখন আমারে বলে, মা আমাদের বাসায় এসেও না খেয়ে বের হয়ে গেছে। এ কথা শুনে আমার বুকের মধ্যে মোচড় মেরে ওঠে।’
প্রকাশ্যে শহীদ মিনার এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলি ও কুপিয়ে নির্মমভাবে কলেজছাত্র রাকিবুল ইসলামকে হত্যার পেছনে নারীসংক্রান্ত বিষয় রয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। একাধিক প্রেমের সম্পর্ক ও হামলাকারীদের একজনের স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী বানানোর চ্যালেঞ্জ করার ক্ষোভ থেকে হত্যার পরিকল্পনা সাজানো হয় বলে জানা গেছে। যদিও নিহতের স্বজনদের দাবি, এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মাদক কারবারের কথা জেনে যাওয়ায় রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে।
মর্গের সামনে রাকিবের স্ত্রী হাবিবা আক্তার গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘গত রবিবার সন্ধ্যার পর রাকিব বলে মিরপুর থেকে তার এক বড় ভাই শহীদ মিনারের দিকে আসছে। সে তাদের সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছে। এরপর রাতে শুনি আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, “বগুড়ায় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিয়ে খেতে গিয়ে খুলনার জান্নাত মুন নামে আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে রাকিবের পরিচয় হয়। এরপর থেকে জান্নাত আমাদের বাসায় যাতায়াত করত। একদিন বাসায় থাকা অবস্থায় সে কার সঙ্গে ফোনে মাদক বহনের বিষয়ে কথা বলে। বিষয়টি নিয়ে রাকিব তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে। এটা জান্নাত তার বয়ফ্রেন্ড সাজিদকে জানালে মাসখানেক আগে সে আমার স্বামীকে ফোনে গালমন্দ করে। একপর্যায়ে বলে, ‘তোরে ঢাকায় এসে খেয়ে দিয়ে যাব। তুই বিষয়গুলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবি না’।”
হাবিবা আরও বলেন, ‘রাকিবের ভিডিও কনটেন্টে একটা মেয়ে কমেন্ট করলে সেখানে জান্নাত মুন গিয়ে উত্তর দেয়। সেখানে কেন জান্নাত উত্তর দিল, এটা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। তাদের ঝগড়ার পর সাজিদ আমাকে বিষয়টা জানায়। আমি ওই সময় বলি, তার কনটেন্টে কে কমেন্ট করল না করল, এটা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তখন সাজিদ একপর্যায়ে হুমকি দিয়ে বলে, আমাদের মধ্যে যেহেতু রাকিব ঝামেলা লাগিয়ে দিয়েছে, তাই আপনি রাকিবের জীবন থেকে সরে যান, না হলে রাকিবকে আপনার জীবন থেকে সরিয়ে দেব। এরপর সপ্তাহখানেক আগে ফোন করে বলে, তোরে তোর এলাকায় এসে গুলি করে যাব। কে কী করে দেখি।’
এই হত্যাকান্ডে জান্নাতের হাত আছে অভিযোগ তুলে হাবিবা বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে জান্নাত মেসেজ দিয়ে আমাদের বাসার গলির নাম জানতে চাই। আমি তাকে বলি, তুমি অগণিতবার বাসায় এসেছ, এখন বলো বাসার গলির নাম কী? তখন তাকে নাজিমউদ্দিন রোডে এসে কল দিতে বলি। এ কথা বলার পর সে আমাকে ফেসবুক থেকে ব্লক করে দেয়।’
এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম বলেন, ঘটনার পরপর এক যুবককে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে নারীঘটিত কোনো বিষয় রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। এ ঘটনায় রাকিবের বাবা তরিকুল ইসলাম খোকন বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিহত রাকিবের শরীরের ১০টি কোপের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া দুটি গুলির চিহ্নও রয়েছে। যার মধ্যে একটি গুলি মাথার ডান পাশে কানের ওপর দিয়ে ঢুকে মাথার বাম পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। আরেকটি পিঠের ডানপাশ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
পরিবার সূত্র জানায়, নিহত রাকিব শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে নাজিমউদ্দিন রোডে ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর থানার পৌর বাত্তা ১ নম্বর ওয়ার্ডে। রাকিবের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলের অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত। তার মা শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত।