বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়, নতুন হলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে রাষ্ট্রের শক্তি আর শুধু অবকাঠামো বা বাজেটের ওপর নির্ভর করে না-নির্ভর করে দক্ষ, সৎ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের ওপর। তাই ‘মেধাতন্ত্র’ শব্দটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যতবার উচ্চারিত হচ্ছে, ততবারই প্রশ্ন জাগে-আমরা কি কেবল পরীক্ষার নম্বর বোঝাচ্ছি, নাকি একটি সমন্বিত কর্মদক্ষতা-সংস্কৃতি?
ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী Michael Young তার The Rise of the Meritocracy গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন-মেধাতন্ত্রও যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীন হয়, তবে তা নতুন অভিজাততন্ত্রে রূপ নেয়। অর্থাৎ ‘যোগ্যতা’ শব্দটি ক্ষমতার ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং মেধাতন্ত্র মানে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়, বরং ধারাবাহিক মূল্যায়ন, নৈতিকতা, ফলাফলভিত্তিক কাজ এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বিশ্ব থেকে শিক্ষা: কাঠামো বদলালে সংস্কৃতি বদলায়
ইউরোপের ছোট রাষ্ট্র Estonia দেখিয়েছে, প্রশাসনিক সংস্কারের কেন্দ্রে ডিজিটাল রূপান্তর রাখলে কীভাবে সেবা-প্রদান বিপ্লব ঘটতে পারে। তাদের ৯৯ শতাংশ সরকারি সেবা অনলাইনে, কাগুজে ফাইলের বদলে ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত। এতে দুর্নীতির সুযোগ কমে, সময় বাঁচে এবং নাগরিকের আস্থা বাড়ে।
এশিয়ায় South Korea ‘KONEPS’ ই-প্রকিউরমেন্ট প্ল্যাটফর্ম চালু করে সরকারি ক্রয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা এনেছে। মধ্যস্বত্বভোগী ও রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে, আফ্রিকার Rwanda গণহত্যা-পরবর্তী পুনর্গঠনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে প্রশাসনকে নতুন করে দাঁড় করিয়েছে-কঠোর অডিট, সম্পদ ঘোষণার বাধ্যবাধকতা এবং দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তাদের সাফল্যের মূল।
আরও এক ভিন্ন উদাহরণ Singapore। সেখানে সিভিল সার্ভিসে উচ্চ বেতন ও কঠোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন পাশাপাশি চলে। ফলাফল-দুর্নীতির নিম্নহার ও দ্রুত নীতি বাস্তবায়ন। অর্থাৎ নৈতিকতার সঙ্গে প্রণোদনাও জরুরি।
ল্যাটারাল এন্ট্রি ও বিশেষজ্ঞের মূল্য
শুধু ক্যাডারভিত্তিক অগ্রাধিকার নয়, বিশেষজ্ঞভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি জরুরি। India ২০১৮ সাল থেকে যুগ্ম সচিব পর্যায়ে ল্যাটারাল এন্ট্রি চালু করে বেসরকারি ও একাডেমিক খাতের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করেছে। এতে নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য এসেছে। যুক্তরাজ্যেও সিনিয়র সিভিল সার্ভিসে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগের সুযোগ রয়েছে-সরকারি-বেসরকারি বিভাজন সেখানে বাধা নয়।
বাংলাদেশে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ‘পলিসি অ্যাডভাইজর’ পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে মন্ত্রী ও সচিব উভয়ের সিদ্ধান্ত-সহায়ক কাঠামো শক্তিশালী হবে। এতে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান-দুটি ধারাই একত্র হবে।
জবাবদিহি: কাগজে নয়, বাস্তবে
World Bank-এর Worldwide Governance Indicators-এ ‘Government Effectiveness’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সন্তোষজনক নয়। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক আস্থার সূচক। তাই অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তি, নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিং, স্বাধীন অডিট-এসবকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দুর্নীতির প্রশ্নে Transparency International-এর জরিপ আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সম্পদ ঘোষণার উন্মুক্ত ডাটাবেস, পারফরম্যান্স অডিট এবং স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী কমিশন ছাড়া সংস্কার অসম্পূর্ণ থাকবে।
বেতন ও প্রণোদনা: ফলাফলের সঙ্গে সংযোগ
উচ্চ বেতন নিজে দুর্নীতি কমায় না, তবে ফলাফলভিত্তিক বেতন (performance-based pay) ও কঠোর শাস্তির সমন্বয় কার্যকর হতে পারে। সরকারি পেনশন দায় দীর্ঘমেয়াদে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করছে-সর্বজনীন পেনশন কাঠামো ও কস্ট-টু-কোম্পানি মডেলে রূপান্তর করলে ব্যয় স্বচ্ছ হবে এবং দায় কমবে।
বিকেন্দ্রীকরণ: মেধার মাঠপর্যায়ের প্রয়োগ
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ মেধাকে স্তব্ধ করে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রকৃত সিদ্ধান্তক্ষমতা ও জবাবদিহি বাড়াতে না পারলে মেধাবী কর্মকর্তারা উদ্যোগ হারান। স্থানীয় সরকারে নগর-পরিকল্পনাবিদ, কৃষিবিশেষজ্ঞ বা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সরাসরি নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা সময়ের দাবি।
রাষ্ট্র বদলায় নির্বাচনে, প্রশাসন বদলায় সংস্কারে। মেধাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মানে শুধু নিয়োগপদ্ধতি বদলানো নয়-সংস্কৃতি বদলানো। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একবারের ঘটনা কিন্তু সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহি প্রতিদিনের অনুশীলন। রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাষ্ট্র গড়তে এই ঝুঁকি নিতেই হবে। কারণ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন ছাড়া উন্নয়নের স্বপ্ন কেবল কাগজেই থেকে যায়।
লেখক: ড. মো. আমিরুল ইসলাম
চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ(গভর্নিং বডি)
কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য, গবেষণা উইং বিএনপি
সদস্য, ফরেন এফেয়ার্স উপ কমিটি, বিএনপি।
