ওয়ান ইলেভেন নিয়ে মুখে কুলুপ মাসুদের

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

পুলিশের হেফাজতে থাকা আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা, ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম কারিগর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে কাবু করতে পারছে না তদন্তকারী সংস্থাগুলো। ২০০৬ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পর অমানুষিক নির্যাতন করাসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন করলেও বেশিরভাগই এড়িয়ে যাচ্ছেন। পাঁচ দিনের রিমান্ডে আনার প্রথম দিনই কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে তদন্তকারী সংস্থার একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে, মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার করা হলেও বেশিরভাগ প্রশ্ন এসেছে ওয়ান ইলেভেনে তার কর্মকা- ও রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা নিয়ে।

এ বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে রিমান্ডে এনে ডিবির একটি ভবনের দ্বিতীয়তলায় রাখা হয়। তাকে চিকিৎসক দেখানোর পাশাপাশি বাসা থেকে ওষুধপত্র দেওয়া হয়। মঙ্গলবার শেষ রাতে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে আজ (গতকাল) দুটি গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা দিনভর দফায় দফায় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেও বেশিরভাগের উত্তর মেলেনি। তিনি খুব কৌশলেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেন। ওয়ান ইলেভেনের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলেও উত্তরে জানিয়েছে, দেশের স্বার্থে তাকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। নেতাদের নির্যাতনের বিষয়টি তিনি জানেন না বলে দাবি করেন। তবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, তার ইশারায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার পাশাপাশি গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার পেছনেও তিনি কাজ করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম কারিগর তিনিই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাকে নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়।

সিআইডি পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রভাব খাটিয়ে তিনি মাস দু-এক আগে মানব পাচার মামলায় নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি মামলার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থও হাতিয়ে নেন। ওই টাকা নিতে তার একজন ক্যাশিয়ার ছিলেন। ইতিমধ্যে ওই ক্যাশিয়ারের নামও উদঘাটন করা হয়েছে। তাকে যেকোনো সময় আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারের সময় তিনি কাউকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় ডিবির এক এডিসি তার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিলে আর কাউকে ফোন দিতে পারেননি। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংস্থার একাধিক গোপন প্রতিবেদন সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে থাকা তথ্যগুলো নিয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কোনোটির উত্তর দিেেয়ছেন কৌশলে। আবার বলেছেন, এসবের বিষয়ে তার জানা নেই। তবে জিজ্ঞাসাবাদে বেশিরভাগ সময়ই তিনি নিশ্চুপ ছিলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মাসুদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। যার এক দিন ইতিমধ্যে চলে গেছে। তিনি সুচতুর প্রকৃতির লোক হওয়ায় নিজেকে আড়াল করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে মাসুদ উদ্দিন এক-এগারোর সেনা শাসনের বিষয়ে কোনো মুখ খুলছেন না। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, মানব পাচার সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য দিলেও ওয়ান ইলেভেনের বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন আলোচিত এ সেনা কর্মকর্তা।

গতকাল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাসুদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে। আসামির উপস্থিতিতে এ-সংক্রান্ত আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ৯ এপ্রিল তারিখ ধার্য করেছেন ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনউদ্দীন চৌধুরী। গত মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের শুনানিতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আসামির উদ্দেশে বলেছিলেন, তিনি (মাসুদ উদ্দিন) মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস, যাকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রায় ১৯ বছর আগে বহুল আলোচিত ‘এক-এগারো’র সময় প্রভাবশালী এই সেনা কর্মকর্তাকে মানব পাচার মামলায় রিমান্ড নেওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার ঝড় ওঠে। ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকেই ফেসবুকে তাকে নিয়ে নানা স্ট্যাটাস দেন। তাদের অনেকেই এখনকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ করেন। ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময় মাসুদ উদ্দিন ছিলেন ক্ষমতার নেপথ্যের একজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা। গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি, শীর্ষ রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, বিশেষ কারাগার, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসসহ সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার নাম। পরে রাজনৈতিক সরকার এলে তার চাকরির মেয়াদ বাড়ে। তারপর হন সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ছিলেন আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত। গ্রেপ্তারকৃত সেনা কর্মকর্তা মাসুদের বিরুদ্ধে ফেনীতে ছয়টি ও ঢাকায় পাঁচটি মামলার তথ্য পান সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা। তার মধ্যে ফেনীতে তিনটি মামলা বিচারাধীন। তিনি পলাতক থাকায় আদালত সেখানে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করেছে। অন্য মামলাগুলোরও তদন্ত চলছে।

পুলিশ সূত্র আরও জানায়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এক-এগারোর পটপরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা বা মূল কুশীলব। তখন তিনি ছিলেন সাভারে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি। তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর-ডিজিএফআইকে সঙ্গে মিলে পুরো পরিকল্পনা সাজান। তখন এমন আলোচনাও ছিল, তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন; যদিও তিনি পরে ওই পরিকল্পনায় যুক্ত হন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যেসব সেনা কর্মকর্তা গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন। তিনি ওইদিন বঙ্গভবনে সশস্ত্র অবস্থায় গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন। চাপের মুখে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তখন একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। সেই পদ থেকেও তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ওয়ান-ইলেভেন সংক্রান্ত বই ‘এক-এগারো’র লেখক মহিউদ্দিন আহমদও তার বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময় যে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।’ ওই সময় আরও তিনজন সেনা কর্মকর্তা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। তারা হলেন তখনকার নাইন ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তখনকার ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ফজলুল বারী এবং তখনকার ডিজিএফআইয়ের আরেকজন কর্মকর্তা ও পরবর্তীকালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এটিএম আমিন। এর মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া অন্যদের কেউই দীর্ঘকাল ধরে দেশে নেই।

পল্টন থানা সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের নামে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মানব পাচার, চাঁদাবাজি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পল্টন থানায় আফিয়া ওভারসিজের মালিক আলতাফ খান বাদী হয়ে মামলা করেন। গত বছর ৩০ অক্টোবর এবং ২ নভেম্বর ঢাকার দায়রা জজ আদালত ও মানব পাচার প্রতিরোধ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলাটির ওপর শুনানি শেষে ডিবিকে মামলাটি পুনরায় তদন্তের আদেশ দেন। মামলার বাদী আলতাফ খান বলেন, আসামিদের প্রভাবে সিআইডি মনগড়া ও পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। আদালত সেই রিপোর্ট বাতিল করে ডিবিকে তদন্ত দিয়ে সুবিচারের পথ খুলে দিয়েছেন। এই মামলায় উল্লেখযোগ্য আসামিরা ছিলেন সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত