মানবজীবন মহান আল্লাহর অমূল্য দান। এই জীবনকে নিরাপদ রাখা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে কিংবা পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছে। অথচ ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা যদি চলি, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
জীবন রক্ষার গুরুত্ব
ইসলামে মানুষের জীবনের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একটি প্রাণকে রক্ষা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা মায়েদা ৩২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জীবন রক্ষা করা কত বড় ইবাদত। সড়কে অসতর্কভাবে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতিতে চলা কিংবা ট্রাফিক আইন অমান্য করা, এসব আচরণ অন্যের জীবনের জন্য হুমকি। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো বড় গুনাহের কাজ।
সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি)
একজন চালক, পথচারী কিংবা যাত্রী, প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে। চালকের দায়িত্ব হলো সতর্কভাবে গাড়ি চালানো, নিয়ম মেনে চলা। পথচারীর দায়িত্ব হলো নির্ধারিত স্থান দিযে রাস্তা পার হওয়া। এই দায়িত্ববোধের অভাবই দুর্ঘটনার বড় কারণ।
ধীরগতি ও সংযম
ইসলাম সব কাজে মধ্যপন্থা ও সংযম শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা চলাফেরায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো।’ (সুরা লুকমান ১৯) এই নির্দেশনা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। গাড়ি চালানোর সময় অতিরিক্ত গতি জীবননাশের অন্যতম কারণ। তাই ধীরে ও নিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো ইসলামি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
অন্যের ক্ষতি না করা
হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিজের ক্ষতি করো না এবং অন্যের ক্ষতিও করো না।’ (ইবনে মাজাহ) এই হাদিসটি সড়ক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেপরোয়া ড্রাইভিং, ওভারটেকিং, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, এসব কাজ নিজের ও অন্যের ক্ষতির কারণ। ইসলাম এসব থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়।
আইন মেনে চলা
ইসলামে শাসকের বৈধ নির্দেশ মানা ফরজ। ট্রাফিক আইন রাষ্ট্র কর্র্তৃক নির্ধারিত একটি শৃঙ্খলা, যা মানুষের নিরাপত্তার জন্য তৈরি। তাই সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, এসব শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, ইসলামের দৃষ্টিতেও গুনাহের কাজ।
ধৈর্য ও সহনশীলতা
হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে জয়ী হয় বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)
রাস্তায় অনেক সময় জ্যাম, দেরি বা অন্য চালকের ভুলে রাগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধৈর্য ধারণ না করলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে। ইসলাম ধৈর্যের মাধ্যমে বিপদ এড়াতে শেখায়।
যাত্রার দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা
ইসলামে ভ্রমণের জন্য বিশেষ দোয়া রয়েছে, ‘সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওয়ামা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনকলিবুন।’ অর্থাৎ মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি, যিনি একে (বাহন) আমাদের অধীন করে দিয়েছেন, অথচ আমরা একে অধীন করতে সক্ষম ছিলাম না। আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তনকারী।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) সফরের উদ্দেশে বের হয়ে সওয়ারির ওপর পা রেখে তিনবার তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলতেন। তারপর এই দোয়া পড়তেন। (সহিহ মুসলিম)
তবে শুধু দোয়া করলেই হবে না, এর সঙ্গে যথাযথ সতর্কতাও অবলম্বন করতে হবে। কারণ ইসলাম তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) ও চেষ্টা, দুটোকেই একসঙ্গে গুরুত্ব দেয়।
ক্লান্তি ও অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি না চালানো
হাদিসে এসেছে, ‘যখন তোমাদের কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে যেন বিশ্রাম নেয়।’ (সহিহ মুসলিম) ঘুমন্ত বা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ইসলাম শরীরের হক আদায় করতে বলে, যা পরোক্ষভাবে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করে।
মাদক ও নেশা থেকে দূরে থাকা
ইসলামে মদ ও সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ। তাই নেশা থেকে বিরত থাকা সড়ক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
জনসচেতনতা সৃষ্টি
ইসলাম মানুষকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে বলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়েদা ২) সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, নিয়ম মানতে উদ্বুদ্ধ করা, এগুলোও একটি ইবাদতের কাজ।
ইসলামে জীবনের নিরাপত্তা
সড়ক দুর্ঘটনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের অবহেলা, অসচেতনতা ও নিয়মভঙ্গের ফল। ইসলাম আমাদের এমন এক জীবনব্যবস্থা দিয়েছে, যেখানে প্রতিটি মানুষের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
যদি আমরা কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা মেনে চলি, সতর্কতা অবলম্বন করি, ধৈর্য ধারণ করি, আইন মানি এবং অন্যের ক্ষতি থেকে বিরত থাকি, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত, নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হওয়া এবং ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী চলাচল করা। তবেই নিরাপদ সড়ক এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর
