হাদিসের বর্ণনায় স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৩ এএম

সুস্থতা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রচণ্ড গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম, যা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুস্থ দেহ ও পবিত্র মন ছাড়া ইবাদতে একাগ্রতা আসে না। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহ ও দিকনির্দেশনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতার এমন এক মানদণ্ড নির্ধারণ করে গেছেন, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও অপরিহার্য হিসেবে স্বীকৃত। এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

পরিচ্ছন্নতা ইমানের অর্ধেক : অপবিত্র অবস্থায় কোনো ইবাদত কবুল হয় না। আবু মালিক আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম) এই ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন মুমিন যখন তার শরীর, পোশাক এবং চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখে, তখন সে প্রকারান্তরে তার বিশ্বাসের একটি বড় অংশকেই পূর্ণ করে। আত্মিক পবিত্রতার পাশাপাশি শারীরিক পবিত্রতাকে এখানে সমান্তরাল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নামাজের আগে অজু করা, নিয়মিত গোসল এবং শৌচকর্মের পর যথাযথভাবে পরিচ্ছন্ন হওয়া ইসলামের মৌলিক নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

মিসওয়াকের গুরুত্ব : ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ছোটখাটো বিষয়েও ইসলাম কতটা যত্নশীল, তার প্রমাণ মেলে দাঁত মাজার প্রতি গুরুত্বারোপ দেখে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কার করার মাধ্যম এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায়।’ (সুনানে নাসায়ি)

তিনি আরও বলেছেন, যদি উম্মতের জন্য কষ্টকর হওয়ার ভয় না থাকত, তবে তিনি প্রতি ওয়াক্ত নামাজের আগে মিসওয়াক করা বাধ্যতামূলক করে দিতেন। আধুনিক স্বাস্থ্যবিদরা মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতাকে হৃদরোগ ও পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন, যা রাসুল (সা.) বহু আগেই উম্মতকে শিখিয়ে গেছেন।

ফিতরাত ও স্বাস্থ্যবিধি : মানুষের শরীরের সহজাত কিছু প্রয়োজন রয়েছে, যা পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে পাঁচটি বিষয়কে ফিতরাত তথা মানুষের প্রাকৃতিক স্বভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, বগলের লোম উপড়ানো, নখ কাটা এবং গোঁফ ছেঁটে ছোট রাখা। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

এই কাজগুলো নিয়মিত করার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন চর্মরোগ ও জীবাণুর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম মানুষকে কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকেই ডাকেনি, বরং তাকে একটি রুচিশীল ও সুস্থ জীবনযাপনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দিয়েছে।

জুমার দিনের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা : সাপ্তাহিক ঈদের দিন অর্থাৎ শুক্রবারে মুসলিমদের বিশেষ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হজরত আবু জর (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, পবিত্রতা অর্জন করে, নিজের সর্বোত্তম পোশাক পরে এবং সুগন্ধি মেখে মসজিদে যায় এবং সেখানে শান্তভাবে অবস্থান করে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ) এটি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি সামাজিক স্বাস্থ্যবিধিও বটে, যা জনসমাগমের স্থানে পরিচ্ছন্ন থাকার গুরুত্ব তুলে ধরে।

পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য : পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা কেবল নিজের দেহ বা ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইসলাম পরিবেশ রক্ষায় কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। হজরত মুয়াজ (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনটি কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা অভিশাপের কারণ হতে পারে। তা হলো মানুষের বিশ্রামের ছায়াঘেরা জায়গা, রাস্তা এবং পানির ঘাটে মলমূত্র ত্যাগ করা। মলমূত্র ত্যাগের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর যে আশঙ্কা থাকে, তা প্রতিহত করার জন্য ইসলাম এই নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি হজরত আবু জর (রা.)-এর অপর এক বর্ণনা মতে, রাস্তা থেকে ক্ষতিকারক বস্তু (যেমন কাঁটা, পাথর বা ময়লা) সরিয়ে দেওয়া একটি সদকা বা দান হিসেবে গণ্য হয়। এই শিক্ষাগুলো একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রোগমুক্ত সমাজ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

চিকিৎসা গ্রহণ ও ওষুধ সেবন : সুস্থ থাকার চেষ্টার পাশাপাশি অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করাও ইসলামের অন্যতম বিধান। হজরত ওসামা ইবনে শরিক (রা.) বর্ণনা করেন, মরুচারী আরবরা যখন রাসুল (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, তারা অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করবে কি না, তখন তিনি উত্তর দিলেন, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কারণ মহান আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধক তিনি তৈরি করেননি, কেবল বার্ধক্য ছাড়া। (সুনানে আবু দাউদ) এই হাদিসটি মুসলিমদের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় উৎসাহিত করে। রোগকে কেবল নিয়তি মনে করে বসে না থেকে যথাযথ প্রতিকার খোঁজা এবং ওষুধ সেবন করা সুন্নাহর অংশ।

শক্তিশালী মুমিন ও শরীরচর্চা : ইসলামে দুর্বলতার চেয়ে শক্তি ও সামর্থ্যকে বেশি পছন্দ করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন অধিক উত্তম ও প্রিয়। (সহিহ বুখারি) এখানে শক্তির অর্থ শারীরিক ও মানসিক উভয়ই হতে পারে। একজন সুস্থ ও সবল মানুষ যেভাবে সমাজ ও মানবতার সেবা করতে পারে এবং ইবাদতে শ্রম দিতে পারে, একজন অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষে তা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অলসতা ত্যাগ করে, যা কিছু উপকারী, তা অর্জনে সচেষ্ট থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিমিত আহার দীর্ঘায়ুর মূলমন্ত্র : সুস্থতা নির্ভর করে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর। আধুনিক অনেক রোগের মূল কারণ হলো অতিরিক্ত ভোজন। হজরত মিকদাম (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, মানুষ তার পেটের চেয়ে খারাপ কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের পিঠ সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। যদি একান্তই বেশি খেতে হয়, তবে পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখা উচিত। (সুনানে তিরমিজি) পরিমিত আহারের এই নীতিটি অনুসরণ করলে মেদভুঁড়ি, বদহজম ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির জন্যই দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, প্রতিটি ক্ষেত্রই সুস্থ-সবল জাতি গঠনের সহায়ক।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত