এক কার্ডেই অনেক আশা

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

রাজধানীর কড়াইল বস্তি। যেখানে খুবই স্বল্প আয়ের মানুষের বাস। অভিজাত এলাকা গুলশান-বানানীর সঙ্গেই অবস্থিত ঘনবসতির এই বস্তি। এখানে বাস করা নারীদের অনেকেই কাজ করেন গৃহকর্মীর। ভোরের সূর্য উকি দিতে না দিতেই তারা নেমে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। গৃহকমীর কাজে চলে যান গুলশান-বনানীর অভিজাত মানুষের বাসায়। পুরুষদের কেউ রিকশা চালান, কেউ চালান ইজিবাইক; কেউ বাস শ্রমিক, কেউ সবজি বিক্রেতা; কেউ ভাঙারির দোকান, কেউ চায়ের দোকান, আবার কেউ ফুটপাতের হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। আবার অনেক অসহায় মানুষেরও বসবাস এখানে। যারা জীবন ধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর মতো উপার্জনও করতে পারেন না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’র জেলে পল্লীর মতোই যেন এই বস্তি। জেলেদের সঙ্গে পার্থক্য শুধু জীবিকার ধরনে। সংসারের একজনের আয়ে কড়াইল বস্তিতেও ঠিক মতো বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। তাদের আর্থিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে, কখনো কখনো আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা বাসাভাড়া দেওয়ার সামর্থ্যও থাকে না। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে যেতে হয়, এই স্বল্প আয়ের টাকায় কী খাবেন, বাসা ভাড়া দেবেন নাকি সন্তানের লেখাপড়াসহ অন্য খরচ মেটাবেন। কিন্তু এখন তাদের জীবনে অনেকটাই স্বস্তি এসেছে। অন্তত বাসাভাড়া দেওয়ার সামর্থটুকু হয়ে গেছে। এখন তারা অনেক আশার স্বপ্ন বুনছেন। তাদের এই সুযোগ এনে দিয়েছে সরকারের দেওয়া ফ্যামিলি কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি দেওয়া হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা করে।

গত ঈদুল ফিতর তাদের জন্য অন্যরকম আনন্দের ছিল। ঈদের আগে পাওয়া ফ্যামিলি কার্ডের আড়াই হাজার টাকা অনেকেই ঈদ উপলক্ষে খরচ করেছেন। এখন তাদের অনেকেই ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছেন। কেউ ফ্যামিলি কার্ডের টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া দেবেন। কেউ আবার এই টাকায় মাসের বাজার করবেন, কেউ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ায় খরচ চালাবেন। কেউ আবার সন্তানের ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। 

ফ্যামিলি কার্ড চালুর এক মাস হলো গতকাল। এই কার্ডের কার্যক্রম উদ্বোধন হয় ১০ মার্চ কড়াইল বস্তিতে।

গতকাল শুক্রবার কড়াইল বস্তিতে সরেজমিন গিয়ে কথা হয় ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া অন্তত ১০ জনের সঙ্গে। তারা জানান, এই এক কার্ডেই বদলে গেছে তাদের জীবনের অনেক হিসাব। তারা জানান, বিত্তবানদের কাছে এই আড়াই হাজার টাকা কিছুই না। কিন্তু তাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে অনেক কিছু। সরাসরি এই নগদ আর্থিক সহায়তা তাদের জন্য অনেক বেশি স্বস্তির।

রংপুরের কুড়িগ্রামের সাবিনা এখন কড়াইল বস্তির বাসিন্দা। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। আর তার স্বামী রিকশা চালান। দুইজনের আয়েও তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সাবিনা বলেন, ‘স্বামীর আয় অল্প, তেমন রুজি নাই। ভাড়ার রিকশা চালায়। জমা দেওয়া লাগে ৪০০ ট্যাকা। ঘরভাড়া দেওয়া, পোলাপান তিনটা, পড়ানো, খাওয়া...। বড় মেয়ে দ্যাশে পড়ে। চলতে খুব সমস্যা।’

এমন পরিস্থিতিতে একটি ফ্যামিলি কার্ড সংসারে আশার আলো দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এত বছর কড়াইলে থাকছি। জীবনে কখনো কোনো কিছু পাইনি। এই প্রথম ফ্যামিলি কার্ডের ট্যাকা ২৫শ পাইলাম। ঘর ভাড়ায় দেওনে আছান হইছে। ঘরভাড়া দেওয়া যায় আরকি।’

সাবিনা বলেন, ‘কাজ করেই তো ট্যাকা ন্যাওন লাগে। তাও সময় মতো পাওন যায় না। আর সরকার কাজ না করিয়েও আমগো এতগুলো টাকা দিচ্ছে। সরকার যতদিন আছে, ততদিন ঘর ভাড়ার জন্য চিন্তা করতে হবে না।’

এ সময় সাবিনার পাশে থাকা এই বস্তির আরেক বাসিন্দা বিউটি বেগম স্বপ্রণোদিতভাবে কথা বলেন। তার বয়স ষাটের কাছে। গ্রামের বাড়ি বরিশালের বরগুনায়। থাকেন বস্তির ঝিলপাড়ের বৌবাজার এলাকায়। বলেন, ‘আমি ২৫ থেকে ২৬ বছর কড়াইলে থাকি। হাসিনা সরকারের আমলে একবার কিসের যেন একটা কার্ড পাইছিলাম। দুই থেকে তিনবার মাল আনার পর তা বন্ধ করে দেছে। আর কখনো পাই নাই। এবার তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হইছে। ফ্যামিলি কার্ড দিছে। যদি সবাই পায়, এটা একটা আনন্দের।’ তিনি বলেন,  ‘কাজের বিনিময়ে টাকা পাইতে গেলে অনেক কষ্ট, এখনো এই বয়সে কাজ করি মানুষের বাসায়। খাওয়া- দাওয়া, ঘরভাড়া.... এই অবস্থায় ২৫শ টাকা অনেক টাকা। অনেক উপকার হয়। আশা করি যারা না পাইছে, ওনার (প্রধানমন্ত্রী) কথা অনুযায়ী সবাই পাবে।’

মিম আক্তার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিবিএ করছেন। গ্রামের বাড়ি বরিশালের বরগুনায়। তার মায়ের নামে ফ্যামেলি কার্ড হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো পরিবারের জন্য এটা ভালো একটা অ্যামাউন্ট। বলা যায়, একটা পরিবারের বাজার হয়ে যায়, এক বস্তা চাল হয়ে যায়, কাঁচা বাজার করা যায়। আমি একজন স্টুডেন্ট। স্টুডেন্টদের জন্য এখনো কোনো কার্ড চালু হয়নি। মায়ের নামে হওয়া এই আড়াই হাজার টাকায় আমার ভার্সিটির বেতন, যাতায়াত খরচটা হয়ে যাচ্ছে। এটা আমার পরিবারের জন্য অনেক কিছু। প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেরও কম সময়ে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

কামরুন্নাহারের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। গৃহিণী। কিছু করেন না। তার স্বামী ১২ হাজার  টাকা বেতনে একটি হোস্টেলে চাকরি করেন। স্বামীর টাকায় সংসার চালাতে হয়। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। একটি মাত্র ছেলে। তার আবার মানসিক সমস্যা থাকায় কোনো কাজ করতে পারে না। ফ্যামিলি কার্ডের কথা শুনতেই খুশিতে প্রাণখোলা একগাল হাসি দিয়ে কামরুন্নাহার বলেন, ‘কার্ডটা পাওয়ায় অনেক উপকার হয়েছে। টাকা সংসারে খরচ করছি। কিছু টাকা ছেলের চিকিৎসার কাজে লাগাইছি। তারেক রহমান আমাদের মতো অসহায় গরিব মানুষের জন্য যা করেছেন, এটা খুব খুশির বিষয়, আল্লাহ তাকে আরও এরকম করার তওফকি দান করুক।’

সামিরন বেগমের বাবা-মা তাকে শখ করে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর সুখ বেশিকাল কাপালে থাকেনি। কয়েক বছর পর স্বামী মারা গেছে। এরপর আবার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্বামী আরেক বিয়ে করে তাকে নিয়ে নোয়াখালী থাকে। সামিরন বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। নিজে আয় করে খাই। ভাঙারি টোয়াই, পয়সা-কড়ি চাই মানুষের কাছে। পোলাপানকে খাওয়া, ঘরভাড়া দিই। ঈদের সময় ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাইছি। জীবনের কোনো সরকার আংগোরে কিছু দেয় নাই। এই বারে আমি ২৫শ টাহা পাইছি। আল্লাহ আমাগো চালায়।’ তিনি বলেন, ফ্যামেলি কার্ডের টাকায় আপাতত তিনি ঘরভাড়া দেবেন। প্রতি মাসে এই টাকা পেলে কয়েক মাস গেলে তিনি খরচ না করে একুট জায়গা কিনে একটি ঘর করার জন্য টাকা জমাবেন।

আরেক নারী বলেন, ‘এডা দেয়ায় এটটা উপকার হইছে। মাইয়া পোলা ন্যায়াপড়া (লেখাপড়া) করাবার লাইগা। এমনে তো ভাইঙ্গা ফ্যালাইলে থাকত না এক টাহাও। মনে করেন মাইয়া পোলা যদি ন্যায়াপড়া করাইতে পারি, ট্যায়াডা একটা কাজে খাটবো।’

ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া আরেক নারী সাহিদা আক্তার। পেশায় গৃহকর্মী। বলেন, ‘মোবাইলে ২৫শ টাকা আইছে। আমার বাচ্চা একটা ছোডো দোকান করছে, দোকানের মধ্যে এই টাকা দিয়ে চা, বিস্কুট তুলতে দিছি।’

এগুলো সবই কড়াইল বস্তির চিত্র। এই বস্তি অনেকটা বিচ্ছিন্ন জগতের মতো। সরু গলিগুলো টিনের চাল আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। অসংখ্য ঘরের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু পথগুলো যেন কোনো এক জটিল গোলকধাঁধার মতো। মাথার ওপর দিয়ে বৈদ্যুতিক তারের জটলা আর নিচে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা এখানকার চিরচেনা দৃশ্য। বস্তির একদিকে গুলশান-বনানীর সুউচ্চ অট্টালিকা আর অন্যদিকে খুপড়ি ঘরগুলো এক অদ্ভুত পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়। লেকের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া বাঁশের সাঁকো আর ছোট ছোট নৌকা এখানকার যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। দিনের বেলা এখানে ছোট ছোট চায়ের দোকান আর বাজারগুলোয় থাকে উপচে পড়া ভিড়, যা এই জনপদের প্রাণচাঞ্চল্য ও জীবনযুদ্ধের কঠোর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। ফ্যামিলি কার্ডের এই টাকা পেয়ে অনেকেই নতুন নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।

বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর ভোটের চিহ্ন মুছে যাওয়ার আগে মাত্র ২১ দিনে ফ্যামেলি কার্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্যামেলি কার্ড বগুড়া থেকে উদ্বোধনের কথা শোনা গেলেও পরে তার পরিবর্তন করে গত ১০ মার্চ ঢাকা ১৭ আসনের কড়াইল বস্তিতে উদ্বোধন করা হয়। প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে সুবিধাভোগীদের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব নম্বরে ২ হাজার ৫০০ টাকা চলে যাচ্ছে। শুরুতে ৩৭ হাজার ৫৬৭ নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৪ কোটি পরিবারকেই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।

জানা গেছে, আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য এই কর্মসূচিতে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রথমে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে এই পরিবারগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই শেষে ৪৭ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা নিচ্ছেন কি না, সরকারি চাকরি বা পেনশন সুবিধা পাচ্ছেন কিনা, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারের নারী প্রধানকে কার্ডের সুবিধা ভোগী নির্বাচন করা হয়, যারা পেয়েছেন সবাই ফ্যামিলি কার্ডের উপকার ভোগ করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত