খোলা আকাশের নিচে হাটবাজারের যে চিরচেনা দৃশ্য একসময় আমাদের যাপনের অংশ ছিল, আধুনিক যুগে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে সুউচ্চ ও সুবিস্তৃত সব সুপার মার্কেট এবং শপিংমল। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
আধুনিক সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় মানুষের যাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপার মার্কেট এবং বিশালাকার শপিংমল। এক সময় মানুষ তার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য কেবল খোলা হাট বা বাজারের ওপর নির্ভর করত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ধারণা আমূল বদলে গিয়েছে। আজকের দিনে মল মানে কেবল কেনাকাটার একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য নয় বরং এটি একটি কৃত্রিম আধুনিক নগরজীবন। যেখানে একই ছাদের নিচে পাওয়া যায় খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে বিশ্বের নামি সব ব্র্যান্ডের পণ্য এবং বিনোদনের অবিশ্বাস্য সব আয়োজন। এই বিশালাকার স্থাপত্যগুলো আজ কেবল বাণিজ্যের কেন্দ্র নয় বরং তা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের সামাজিক মিলনস্থল এবং আধুনিক সভ্যতার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আয়তনের বিশালত্ব
বিশ্বের বড় মলগুলোর দিকে তাকালে প্রথম যে বিষয়টি বিস্ময় জাগায় তা হলো এদের আয়তন। দুবাই মলের কথাই ধরা যাক, যা আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম বিশাল এক স্থাপত্য। এখানে এক হাজার দুইশর বেশি দোকান রয়েছে এবং এর ভেতরেই রয়েছে বিশাল এক অ্যাকোয়ারিয়াম ও ইনডোর আইস রিঙ্ক। এই মলটি কেবল কেনাকাটার জায়গা নয় বরং পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। একইভাবে আমেরিকার মল অব আমেরিকা কেবল একটি শপিং সেন্টার নয়, এটি যেন একটি ঘরের ভেতরের শহর। এখানে রোলার কোস্টার রাইড থেকে শুরু করে বড় বড় থিম পার্কের উপস্থিতি একে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। কানাডার ওয়েস্ট এডমন্টন মল কিংবা ফিলিপাইনের এসএম মল অব এশিয়া প্রতিটিই তাদের নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী এবং সুবিশাল পরিসরের কারণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই মলগুলো নির্মাণের পেছনে কাজ করে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং প্রকৌশলবিদ্যার অদ্ভুত সব কারিশমা। বিশাল সব গম্বুজ স্বচ্ছ কাঁচের ছাদ এবং কয়েক তলা বিশিষ্ট এই ভবনগুলো মানুষের ভোগবাদী আকাক্সক্ষাকে এক নতুন রূপ দেয়।
আধুনিক সভ্যতার নতুন শহর
মলকে কেবল একটি বাজার হিসেবে দেখা এখন আর সম্ভব নয়, কারণ এটি মানুষের জীবনে এক নতুন ধরনের সামাজিক ভূমিকা পালন করছে। নগরায়ণের ফলে খোলা জায়গা বা পার্কের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মানুষ এখন মলের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাইরের জগতের তপ্ত রোদ কিংবা কনকনে শীত থেকে মুক্তি পেতে মলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ মানুষের কাছে এক আশ্রয়ের মতো হয়ে উঠেছে। এখানে রয়েছে সাজানো গোছানো ফুড কোর্ট যেখানে দেশি বিদেশি নানা স্বাদের খাবার পাওয়া যায়। এ ছাড়া আধুনিক সিনেমা হল বা মাল্টিপ্লেক্স মানুষের বিনোদনের চাহিদাকে মলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এর ফলে মলে যাওয়া মানে কেবল কেনাকাটা করা নয় বরং পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কৃত্রিম এক নগর জীবনের স্বাদ নেওয়া। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই মলগুলো এখন আধুনিক সভ্যতার নতুন সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, যেখানে মানুষ একে অপরের সংস্পর্শে আসে কিন্তু সেটি একটি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক কাঠামোর ভেতরে।
অবিশ্বাস্য সব বিনোদন
বিশ্বের বড় মলগুলো গ্রাহককে আকৃষ্ট করতে নিত্যনতুন এবং অবিশ্বাস্য সব ধারণার প্রয়োগ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত মলে রয়েছে ইনডোর স্কি স্লোপ, যেখানে মরুভূমির তপ্ত আবহাওয়ার মাঝেও মানুষ বরফের ওপর স্কি করার অভিজ্ঞতা নিতে পারে। কোনো মলে আবার বিশাল জলপ্রপাত বা ঝরনা তৈরি করা হয়েছে, যা ক্রেতাদের এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়। অনেক মলের ভেতরেই রয়েছে আস্ত একেকটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, যেখানে বড়দের পাশাপাশি শিশুদের জন্য রোমাঞ্চকর সব রাইড রাখা হয়েছে। কোনো কোনো মলে আবার বিশাল আইস রিঙ্ক বা কৃত্রিম সমুদ্রসৈকত তৈরি করা হয়েছে। এসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেতাকে মলের ভেতরে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা। মানুষ যত বেশি সময় মলে অতিবাহিত করবে তার কেনাকাটার সম্ভাবনা তত বাড়বে। এই ধারণা থেকেই মলের ভেতরে অ্যাকোয়ারিয়াম চিড়িয়াখানা এবং আন্তর্জাতিক মানের পারফরম্যান্স বা কনসার্টের আয়োজন করা হয়।
সুপার মার্কেট থেকে মেগা মল
কেনাকাটার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এটি এক দীর্ঘ বিবর্তনের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই মেগা মলের পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুরুর দিকে মানুষ খোলা মাঠে বা রাস্তার ধারে পণ্য বিনিময় করত। শিল্প বিপ্লবের পর শহরে স্থায়ী দোকানের প্রচলন শুরু হয়। এর পরবর্তী ধাপ ছিল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, যেখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আলাদা আলাদা বিভাগে সাজিয়ে রাখা হতো। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সুপার মার্কেটের ধারণা জনপ্রিয়তা পায় যেখানে গ্রাহক নিজেই ট্রলি নিয়ে নিজের পছন্দের পণ্য পছন্দ করতে পারেন। এরপরই আসে হাইপার মার্কেটের ধারণা, যা সুপার মার্কেটের চেয়েও বড় এবং যেখানে গ্রোসারি পণ্যের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স এবং গৃহস্থালির যাবতীয় জিনিস পাওয়া যায়। আধুনিক মেগা মল হলো এই বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ, যেখানে শত শত সুপার মার্কেট এবং বিশেষায়িত ব্র্যান্ড শপ একই সঙ্গে অবস্থান করে। এই বিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ভোগ করার প্রবণতাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুঁজিবাদ ভোগবাদ
মলের এই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের পেছনে রয়েছে পুঁজিবাদের এক গভীর দর্শন। মলগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়, যেন মানুষ সেখানে প্রবেশের পর বাইরের পৃথিবীর কথা ভুলে যায় এবং সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মলের ভেতরে সাধারণত কোনো জানালা বা ঘড়ি থাকে না, যাতে ক্রেতা বুঝতে না পারে সে কতক্ষণ সেখানে রয়েছে। একে বলা হয় অভিজ্ঞতার অর্থনীতি বা এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি। এখানে মানুষ কেবল একটি সাবান বা জামা কিনতে যায় না বরং সে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যায়। বিজ্ঞাপনের জাদুকরী প্রভাবে মানুষ এখন মলে যাওয়াকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য করে। অনেকে মলকে আধুনিক যুগের ক্যাথেড্রাল বা উপাসনালয়ের সঙ্গে তুলনা করেন, কারণ মানুষ এখন ছুটির দিনে উপাসনালয়ের চেয়ে মলেই বেশি সমবেত হয়। এই ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে প্রতিনিয়ত নতুন পণ্য কেনার জন্য প্ররোচিত করে, যার ফলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার পরিমাণও অনেক বেড়ে গিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া
গত দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যেমন ভারত এবং বাংলাদেশে মল সংস্কৃতির এক অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় বৃদ্ধি এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে এই দেশগুলোর বড় শহরগুলোতে এখন বিশালাকার সব মল গড়ে উঠছে। ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্ক কিংবা বসুন্ধরা সিটি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে কেবল শপিং সেন্টার নয় বরং একেকটি ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই দেশগুলোতে মল আসার ফলে কেনাকাটার ধরন বদলে গিয়েছে। মানুষ এখন ধুলোবালি বা ভিড় এড়িয়ে স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পছন্দ করে। তবে এই মল সংস্কৃতির কারণে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পাড়ার ছোট দোকানগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তবুও আধুনিক জীবনের প্রয়োজনেই হোক বা আভিজাত্যের টানে দক্ষিণ এশিয়ায় মলের জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে উৎসবের সময়গুলোতে এই মলগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় আধুনিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ই-কমার্সের যুগ
ইন্টারনেটের প্রসার এবং ই-কমার্সের জয়জয়কারের ফলে বর্তমান সময়ে মলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। মানুষ যখন ঘরে বসে মোবাইল ফোনের এক ক্লিকেই পণ্য হাতে পেয়ে যাচ্ছে তখন সে কেন কষ্ট করে ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে মলে যাবে। এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে অনেক নামি দামি মল এখন নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা এখন কেবল পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর না করে বিনোদনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। মলগুলো এখন আরও বেশি লাইফস্টাইল সেন্টারে পরিণত হচ্ছে, যেখানে শরীরচর্চা কেন্দ্র নামি রেস্তোরাঁ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ জায়গা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। অভিজ্ঞদের মতে, ই-কমার্স হয়তো কিছু মলের জন্য হুমকি হতে পারে, তবে মলের যে সামাজিক আবেদন রয়েছে তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়। মানুষ সবসময়ই সশরীরে অন্যের সঙ্গে মিশতে এবং বিশেষ পরিবেশে সময় কাটাতে পছন্দ করবে, যা মলের অস্তিত্বকে আগামীর পৃথিবীতেও টিকিয়ে রাখবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি
একটি বিশাল মলের পরিচালনা কেবল বাণিজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই বরং এটি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। দোকানের বিক্রয়কর্মী থেকে শুরু করে নিরাপত্তা প্রহরী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং কারিগরি প্রকৌশলী মিলিয়ে একটি মলে বিশাল এক কর্মী বাহিনী কাজ করে। এটি একটি দেশের জিডিপিতে বড় ধরনের অবদান রাখে। এ ছাড়া একটি বড় মল যখন কোনো এলাকায় গড়ে ওঠে তখন তার আশপাশের জমির দাম এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের দৃশ্যপট বদলে যায়। মলের কারণে দেশি-বিদেশি বড় বড় ব্র্যান্ডের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। তবে এর বিপরীত পিঠে বৃহৎ পুঁজির এই আগ্রাসন অনেক সময় ছোট ব্যবসায়ীকে কোণঠাসা করে ফেলে, যা সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করতে পারে। তবুও আধুনিক বাজার ব্যবস্থায় মলের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
পৃথিবীর বড় বড় সুপার মার্কেট এবং মলগুলো আধুনিক সভ্যতার আয়না হিসেবে কাজ করছে। এগুলো আমাদের উন্নতির কথা বলে আবার আমাদের মাত্রাতিরিক্ত ভোগবাদী আচরণের দিকটিও ফুটিয়ে তোলে। বিশাল সব স্থাপত্যের কারুকাজ আর ঝকঝকে আলোকসজ্জার আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিশ্ব অর্থনীতির এক জটিল সমীকরণ। মলগুলো এখন কেবল ইটের দালান নয় বরং তা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামীর পৃথিবীতে মলের রূপ হয়তো বদলে যাবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তা আরও বেশি স্মার্ট হয়ে উঠবে কিন্তু মানুষের সমবেত হওয়ার এই আকাক্সক্ষা এবং কেনাকাটার আনন্দ মলগুলোকে চিরকালই প্রাসঙ্গিক করে রাখবে। আধুনিক নগরায়ণের এই অবিচ্ছেদ্য অংশটি তাই যুগে যুগে মানুষের চাহিদাকে নতুন রূপ দিয়ে যাবে এবং বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেবে বাণিজ্যের এক নতুন এবং অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের সঙ্গে।
