মহাকাশে আধিপত্যে চীনও সমান তালে

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম

চাঁদকে ঘিরে সফল পরীক্ষামূলক অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন নাসার চার নভোচারী। বাংলাদেশ সময় গতকাল শনিবার ভোর ৬টা ৭ মিনিটে (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিট) তাদের বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনো মানববাহী মহাকাশযান চাঁদকে প্রদক্ষিণ করল।

আর্টেমিস ২ নামের এই ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন তিন মার্কিন ও এক জন কানাডীয় নভোচারী। তারা হলেন ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার, জেরেমি হ্যানসেন ও রিড ওয়াইজম্যান। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে একটি বেজ স্থাপনসহ চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এটি ছিল গত পাঁচ দশকের বেশি সময় পর প্রথম চাঁদের চারপাশে মানুষের ঘুরে আসার অভিযান।

গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে আর্টেমিস ২ মিশনের অরিয়ন মহাকাশযানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। উৎক্ষেপণ থেকে অবতরণ পর্যন্ত এই অভিযানে সময় লেগেছে ৯ দিন ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। পুরো অভিযানটি ছিল অসংখ্য রেকর্ড ও অনন্য সব মুহূর্তে ঘেরা। এই অভিযানে একটি নতুন রেকর্ডও তৈরি হয়েছে। এই চার নভোচারী পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল (৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার) দূরে ভ্রমণ করেছেন, যা মানব ইতিহাসে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড।

অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করে নভোচারীদের নিরাপদে ফিরে আসার এ ঘটনায় যখন নানা মহলে উচ্ছ্বাসের বন্যা বইছে, তখন পাশাপাশি আলোচনা চলছে চীনের এক উচ্চাকাক্সক্ষী মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানো, একটি চন্দ্রঘাঁটি নির্মাণ, তারপর মঙ্গল অভিযানের দিকে এগোনোর পরিকল্পনা ও সক্ষমতা গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ প্রায় তিন দশক ধরে চালিয়ে আসছে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোই তাদের লক্ষ্য।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র বলছে ২০২৮ সালে তাদের নভোচারীরা ফের চাঁদে পা রাখতে যাচ্ছেন। গতকাল নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান আর্টেমিস টু-এর সফরকে একটি ‘নিখুঁত মিশন’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ‘আমরা আবারও চাঁদে নভোচারী পাঠানোর ধারায় ফিরে এসেছি। আর এটি কেবল শুরু। ২০২৮ সালে চাঁদে পা রাখা এবং সেখানে আমাদের ঘাঁটি তৈরির আগ পর্যন্ত আমরা এখন নিয়মিত বিরতিতে এই মিশনগুলো চালিয়ে যাব।’

সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্টেমিস ২-এর নভোচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পুরো সফরটি ছিল এককথায় অসাধারণ, অবতরণও হয়েছে নিখুঁত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি অত্যন্ত গর্বিত! আমি শিগগিরই হোয়াইট হাউজে আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছি। আমরা আবারও এমন অভিযান পরিচালনা করব এব আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে মঙ্গল গ্রহ!’

আর্টেমিস ২ অভিযানের প্রেক্ষাপটে বার্তা সংস্থা এএফপি সম্প্রতি চীনের উচ্চাকাক্সক্ষী মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি এবং একটি মহাকাশ স্টেশন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চীনের মানববাহী মহাকাশ কর্মসূচি ‘প্রজেক্ট ৯২১’ শুরু হয়। ২০০৩ সালে প্রথম চীনা মহাকাশচারী ইয়াং লিওয়েইর মহাকাশযাত্রার পর থেকে এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৫টি মানববাহী মিশন পরিচালিত হয়েছে। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় চীন। এরপর থেকে তারা নিজস্ব কক্ষপথের কেন্দ্র তৈরির দিকে এগোয়। তাই গড়ে তোলা হয় ‘তিয়ানগং’ মহাকাশ স্টেশন, যার অর্থ ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’।

২০২১ সালে প্রথম মহাকাশচারীদের স্বাগত জানায় এই স্টেশন। বর্তমানে সেখানে ‘তাইকোনট’ নামে তিন জন চীনা মহাকাশচারী অবস্থান করছেন। এই স্টেশন চীনকে স্পেসওয়াক, ডকিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানবদেহে মহাকাশের প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিয়েছে। এ পর্যন্ত চীনের কোনো মানববাহী মহাকাশ উৎক্ষেপণ প্রাণঘাতী হয়নি। পুরো কর্মসূচি ধাপে ধাপে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মেনে এগিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড ডি গ্রেইজ এএফপিকে বলেন, ‘এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, স্থিতিশীল অর্থায়ন এবং পুরো শিল্প খাতকে যুক্ত করার সক্ষমতা।’ তার ভাষ্য, ‘পশ্চিমা পদ্ধতিতে- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অগ্রাধিকার বদলে যায়। সেই তুলনায় চীনের মডেল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর থাকে।’

চীনের মহাকাশ সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এরই মধ্যে চীন একাধিক রোবট মিশন পাঠিয়ে চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে মানববাহী অভিযানের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের জটিল প্রযুক্তি, যা এখনো পরীক্ষাধীন। ২০২৬ সালে ‘মেংঝো’ বা ‘ড্রিম শিপ’ নামের নতুন মহাকাশযানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি পুরনো ‘শেনঝৌ’ মহাকাশযানের জায়গা নেবে এবং মহাকাশচারীদের চন্দ্রকক্ষপথে পৌঁছে দেবে। এর পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে প্রায় ৯০ মিটার দীর্ঘ শক্তিশালী রকেট ‘লং মার্চ-১০’, যা চাঁদের পথে মহাকাশযান পাঠাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মহাকাশচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামাতে সক্ষম ‘লানইউয়ে’ নামের ল্যান্ডার ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নও করতে পারে। দেশটি ২০৩৫ সালের মধ্যে ‘ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন (আইএলআরএস)’ নামে একটি চন্দ্রঘাঁটির প্রাথমিক সংস্করণ তৈরিরও পরিকল্পনা করেছে। চীনের লক্ষ্য চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং চন্দ্রসম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা। ২০৪০ সালের দিকে এই ঘাঁটির আরও বড় সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা? : চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চাঁদের দৌড়’ বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কথা বলে না। মহাকাশ বিশ্লেষক জনাথন ম্যাকডাওয়েল এএফপিকে বলেন, ‘চীন তাদের কর্মসূচিকে স্বাভাবিক অগ্রগতির অংশ হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র না গেলেও তারা চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা করত।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘চীন যদি আগে চন্দ্রঘাঁটি তৈরি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই কাজ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে, কারণ উপযুক্ত জায়গা খুবই সীমিত।’

চীনের মহাকাশ কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ চেন ল্যান বলেন, আপাতত মানববাহী অভিযানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। তার মতে, ‘নাসার ড্রাগন ও ওরিয়ন মহাকাশযান এখনো চীনের শেনঝৌর চেয়ে উন্নত। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে চীন নতুন মহাকাশযান ও ল্যান্ডার ব্যবহার করে চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে উঠবে।’

এরপর কি মঙ্গল? : চীনের মহাকাশ সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের পর চন্দ্রঘাঁটি ব্যবহার করে মঙ্গলগ্রহে মানববাহী মিশনের প্রযুক্তি ও সক্ষমতা যাচাই করা হবে। চীনের বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে মঙ্গলকে ভবিষ্যৎ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। চেন ল্যান বলেন, ‘তবে চাঁদে অভিযান ও প্রাথমিক ঘাঁটি নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মঙ্গল নিয়ে বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল বলেছেন, ‘আমরা আবারও এমন অভিযান পরিচালনা করব এবং আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে মঙ্গল গ্রহ!’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত