মণিপুরিদের ‘লাই হারাওবা’

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

খোলা মাঠ পেরিয়ে দমকা হাওয়ার ঝাপটায় দুলছে গাছের শাখা-প্রশাখা। বৈশাখের ভ্যাপসা গরমকে দূরে সরিয়ে এনে দিয়েছে এক স্বস্তির বিকেল। সেই মনোরম পরিবেশেই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার তেতইগাঁওয়ের মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে নিজেদের প্রাচীন ঐতিহ্যের উৎসব ‘লাই হারাওবা’য় মাতলেন মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষজন।

গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের শেষ দিন শুক্রবার (১০ এপ্রিল) বিকেল থেকেই জমে ওঠে আয়োজন। শামিয়ানার নিচে দর্শকের ভিড় বাড়ে আর নৃত্যশিল্পীরা প্রস্তুত হন পরিবেশনার জন্য। ঢোল-খোল, বাঁশি, পেনাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। সন্ধ্যা নামতেই উন্মুক্ত মঞ্চে শুরু হয় নৃত্যপর্ব। নারী, কিশোরী ও শিশুদের অংশগ্রহণে মঞ্চ যেন জলতরঙ্গের মতো দুলে ওঠে। সুর, তাল ও মুদ্রার মূর্ছনায় সন্ধ্যা ডুবে এক স্নিগ্ধ, প্রার্থনাময় আবহে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ে অবস্থিত মণিপুরি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে ভিড় জমে। তিনদিনের এই উৎসবের শুরু থেকে চলে নানা আচার-অনুষ্ঠান। উৎসবের অর্থায়ন করেছে ইউনেস্কো বাংলাদেশ। বাস্তবায়নে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।

উৎসব প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে থাকলে জমে ওঠে মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ। ক্রমে শ্রোতা-দর্শকে পূর্ণ হয়ে ওঠে শামিয়ানার নিচে পেতে রাখা খালি চেয়ারগুলো। আচার-অনুষ্ঠান, নাচে অংশ নিতে অংশগ্রহণকারীরাও সক্রিয়, সচল হয়ে ওঠেন। ঢোল-খোল, বাঁশি, পেনাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর বেজে ওঠে, প্রাঙ্গণজুড়ে চলতে থাকে সুরের ঝংকার। রাতের আঁধার নামলে উন্মুক্ত মঞ্চে উপস্থিত হন সমবেত শিল্পীরা। ক্রমে নারী, তরুণী ও শিশু-কিশোরীরা নৃত্যে অংশ নিতে থাকেন। গান ও সুরের তালে, নানা মুদ্রায় দীর্ঘ সময় ধরে নাচ চলতে থাকে।

আয়োজকরা জানান, লাইহারাওবা মণিপুরি জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র উৎসব। লাই অর্থ দেবতা, হারাওবা আনন্দ, অর্থাৎ দেবতাদের আনন্দোৎসব। এর কেন্দ্রবিন্দু লাইহারাওবা জগোইথ, যা মণিপুরি নৃত্যের আদিরূপ হিসেবে বিবেচিত। এই নৃত্যের মাধ্যমে মাইবি (নারী পুরোহিত) দেবতাদের সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রকৃতি ও মানবজীবনের নানা পর্যায় তুলে ধরেন।

উৎসব দেখতে আসা বাংলাদেশের প্রখ্যাত মণিপুরি নৃত্যশিল্পী এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষক তামান্না রহমান বলেন, ‘মণিপুরি নৃত্যের যে ধ্রুপদী বা শাস্ত্রীয় রূপ আমরা চিনি, তার মূল ভিত্তি হলো এই লাই হারাওবা।

লাই হারাওবা হচ্ছে একটি সামগ্রিক আর্ট ফর্ম, যেখানে সৃষ্টির আদি ইতিহাস নাচের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।’

লাই হারাওবা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য সচিব ওইমান লানথই বলেন, ‘এটি মণিপুরি জনগোষ্ঠীর এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা প্রাচীন মেইতেই সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে ধারণ করে।’

কমিটির আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা শ্যামল বলেন, ‘মাইবিদের নৃত্য এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ, যার মাধ্যমে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, আধ্যাত্মিক চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়। ইউনেসকো বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সহায়তায় আয়োজিত এই উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত