চলতি সপ্তাহের টানা দুদিনের কালবৈশাখী হাওয়া ও বৃষ্টিতে কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। উৎপাদিত ও উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় থাকা বিপুল পরিমাণ লবণ পানিতে মিশে যাওয়ার কারণে প্রান্তিক চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাজারের অস্থিরতার কারণে এমনিতেই চাষিরা উৎপাদন মূল্য পাচ্ছিলেন না, তার ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ‘সাদা সোনা’খ্যাত লবণ এখন চাষিদের জন্য আশীর্বাদের বদলে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৌসুমের দ্বিতীয় দফায় গত ৭ ও ৮ এপ্রিল রাতে প্রবল ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এতে মহেশখালীর কুতুবজোম, বড় মহেশখালী, কালারমারছড়া, ধলঘাট ও মাতারবাড়ি এলাকার লবণচাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কালারমারছড়া ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম, আমির, কবির এবং ধলঘাট ইউনিয়নের সোহেল ও আবু শামা জানান, আকস্মিক বৃষ্টিতে তাদের কয়েকশ মণ লবণ নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগবে।
লবণচাষি ওসমান জানান, ‘মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই কয়েকশ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে। এখন আবার নতুন করে মাঠ তৈরি করতে হবে। এই অবস্থায় পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
ধলঘাট এলাকার চাষি আরমান বলেন, ‘ঋণ করে মাঠ নিয়েছি। বাজারে লবণের দাম কম, তার ওপর ঝড়ে সব শেষ। এখন ঋণ শোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
চাষিরা জানান, লবণ চাষ করে বর্তমানে তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অথচ বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। ফলে প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
চাষিদের অভিযোগ, ন্যায্যমূল্য থেকে তারা বঞ্চিত হওয়ার কারণ দালাল সিন্ডিকেট। আগাম টাকা দিয়ে দালালদের মাধ্যমে জমি ইজারা নিতে হয়। তারপর বিক্রি করতে গিয়ে ওজনের ক্ষেত্রে অনিয়মের শিকার হন। যেখানে আগে ৪০ কেজিতেই এক মণ ধরা হতো, সেখানে এখন ৫৭-৬০ কেজিতে ধরা হচ্ছে। তার ওপর রয়েছে দালালদের কমিশন। প্রতি মণে শতাধিক টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজারের কর্মকর্তা জাফর ইকবাল জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় আবার উৎপাদনে অতিরিক্ত শ্রম ও ব্যয় বাড়বে। কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তবে অন্য বছরের তুলানায় লবণের বাজার অনেকটাই আছে বলে তিনি দাবি করেন। তার দাবি, বর্তমানে চাষিরা মণপ্রতি ২৫০ টাকা পাচ্ছেন।
লবণ চাষসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের লবণ শিল্পকে সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রান্তিক চাষিরা আরও সংকটে পড়বেন। তারা লবণ আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় লবণচাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের নেতা হাবাইব সজীব বলেন, ‘প্রান্তিক চাষিদের জন্য বিনা শর্তে সরকারি সহায়তা, সঠিক ওজন ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’