বাঙালি জাতি নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যাশায় কাক্সিক্ষত জীবনের লক্ষ্যে নতুনভাবে জীবনের যাত্রা শুরু করে। দিনটি ঘিরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা উৎসব আমেজে লিপ্ত থাকে বাঙালি। কিন্তু এ উৎসব ঘিরে প্রতি বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার বলায় দেখা যায়। কোনো ধরনের ঝুঁকির শঙ্কা না থাকলেও শোভাযাত্রা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের পার্ক, রাস্তাঘাটে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। এ ছাড়া ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, গ্যাস বেলুন ও ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। একই সঙ্গে দেশব্যাপী সব অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই শেষ করতে হবে বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের আয়োজিত শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা অনেক বেশি দেখা গেছে। শোভাযাত্রার সামনে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে থাকে আধুনিক সব অস্ত্র। এ ছাড়া সামনে-পেছনে, পোশাকে-সাদা পোশাকে, সোয়াত টিম, মোটরসাইকেল টিম, ড্রোন উড়িয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের যে আস্থা, সেটি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করতে হবে।
ডিএমপি উপকমিশনার (জনসংযোগ) এনএম নাসিরুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কোনো হুমকি বা ঝুঁকির শঙ্কা নেই। তবু নববর্ষ ঘিরে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য যদি বলেÑ কোনো হুমকি নেই, তাহলে কেন এত নিরাপত্তা, কেন এই সশস্ত্র মহড়া উল্লেখ করে বাংলাদেশ উদীচি শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফ নূর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণ মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসব উদযাপন হয় না। উৎসব হয় নির্ভয়, নিরাপত্তায়Ñ যেখানে মানুষ আসবে, আনন্দ করবে, হাসবে এবং মন খুলে কথা বলবে। রাষ্ট্র সাধারণ মানুষকে ভয়ের মধ্যে রাখতে চায়। অতীতে এটা করেছে, এখনো করছে। শোভাযাত্রায় পাঞ্জাবি-টুপি পরা লোকও অংশগ্রহণ করেন। নিরাপত্তার নামে সশস্ত্র মহড়া দেওয়ার প্রয়োজন নেই। জনগণকে ফ্রি করে দেন, নাগরিক অধিকার অর্জনের সুযোগ দেন।
এ উৎসব ঘিরে নানা বিভাজন থাকলেও নববর্ষ বাঙালি জাতির ঐতিহ্য উল্লেখ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনেকেই এই উৎসবকে নীতিগতভাবে সমর্থন করে না। কিন্তু আমরা বাঙালি জাতি, এটা আমাদের সংস্কৃতি।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণে যেসব নিয়মনীতি : নববর্ষের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা মুখোশ পরে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে মুখোশ হাতে নিয়ে বহন করা যাবে। প্রদর্শনীর জন্য তৈরি মুখোশ এমনভাবে প্রদর্শন করা যাবে না, যাতে মুখ ঢেকে থাকে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের শুরুতেই যোগ দিতে হবে। মিছিল শুরুর পর মাঝপথে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। সাধারণ মানুষ ব্যাগ, ব্যাকপ্যাক, দিয়াশলাই বা লাইটার বহন না করা। এ ছাড়া বিজ্ঞাপনী স্টিকার বহন করে বৈশাখী শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ না করা, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে চারুকলা ইনস্টিটিউটের স্বেচ্ছাসেবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রোভার স্কাউট সদস্যদের পরামর্শ মেনে চলা, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিক নিকটস্থ পুলিশকে অবহিত করা এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রবীন্দ্র সরোবর, রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ সব উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান সমাপ্ত করতে হবে।
নববর্ষ ঘিরে ডিএমপির নিরাপত্তা : রাজধানীতে নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা জোরদার করেছে ডিএমপি। এ বছর রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর ও হাতিরঝিল এলাকাসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান হবে। এতে ডিএমপির পক্ষ থেকে পুলিশকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রমনা বটমূল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করা হবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে যেসব নিষেধাজ্ঞা : ডিএমপি জানিয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, গ্যাস বেলুন ও ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০০ ফিট এলাকায় মোটরসাইকেল বা কার রেসিং বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১৪ এপ্রিল ঢাবির মেট্রোরেল স্টেশন নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ থাকবে। ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার পর বিশ্ববিদ্যালয় স্টিকারবিহীন কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।