ব্যবসায়ীরা চান সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী বাজেট

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ব্যবসায়ীদের জন্য যেন ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে বরং ‘সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী’ হয় এমন আহ্বান জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) নেতারা। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়া, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, চড়া সুদের হারসহ সংকটের মধ্যে যাতে ব্যবসার সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা যায়, সে অনুযায়ী বাজেট প্রণয়নের দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। 

গতকাল রবিবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব দাবি করেন ব্যবসায়ীরা। এমসিসিআই এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া, নিউএইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, উচ্চ সুদহার এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের বিনীত প্রত্যাশা, আসন্ন জাতীয় বাজেটটি যেন ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে বরং ‘সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী’ হয়।

অনুষ্ঠানে এমসিসিআই সভাপতি ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে করজাল সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, করপোরেট কর কমানো, ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল তৈরি, পিএসআর ও আইনি অসংগতি দূর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং এসএমই খাতকে সুরক্ষা প্রদান।

এসব প্রস্তাব তুলে ধরে কামরান টি রহমান বলেন, দেশে ১ কোটির বেশি টিআইএন থাকলেও অর্ধেকেরও কম রিটার্ন জমা দেন। আমাদের প্রস্তাব হলো এনআইডি ও টিআইএন ডাটাবেজ পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূত করা। এ ছাড়া নতুন করদাতাদের ভীতি দূর করতে বছরে মাত্র ১০০ বা ১ হাজার টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজ রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা হোক।

করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব দিয়ে কামরান টি রহমান বলেন, করপোরেট কর কমানো হলেও ‘নগদ লেনদেনের’ কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাচ্ছে না। আমাদের অর্থনীতির বাস্তবতায় এই শর্তটি বাতিলের অনুরোধ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার আরও ২.৫ শতাংশ কমানো হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে। এ ছাড়া আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমসের জন্য আলাদা পোর্টাল না রেখে একটি সমন্বিত ‘ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি দুই-ই কমবে। এ ছাড়া অনলাইন শুনানি ও ডিজিটাল নোটিশ পদ্ধতি চালু করলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ বাঁচবে।

সভায় বক্তারা জানান, ৩৯টি ক্ষেত্রে পিএসআর বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি ব্যবসা সহজীকরণের অন্তরায়। এ ছাড়া আয়কর আইন ২০২৩-এর কিছু ধারা (যেমন : ছয় বছরের অধিককাল সম্পদ বিবেচনা) বাস্তব অবস্থার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এগুলো পুনর্বিবেচনা করার করা উচিত। ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষায় মুসক ৪.৩ ফরমে ‘মূল্যমান’-এর পরিবর্তে শুধু ‘পরিমাণ’ উল্লেখ করার সুযোগ চান ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে কাস্টমস পর্যায়ে ডাটাবেজ মূল্যের পরিবর্তে প্রকৃত ‘লেনদেন মূল্য’ অনুযায়ী শুল্কায়ন নিশ্চিত করা এবং অটোমেশন প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি।

এসএমই খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়ে এমসিসিআই সভাপতি বলেন, আমাদের অর্থনীতির প্রাণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এই খাতের বিকাশে পৃথক কর হার এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট হ্রাস করা হলে দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বাজেটে বড় অঙ্কের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে তা বিদ্যমান করদাতাদের জন্য হয়রানির কারণ হতে পারে। যখনই রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়, তখন যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এতে নতুন করদাতারা কর দিতে নিরুৎসাহিত হন।

তিনি বলেন, উচ্চ আয়ের অনেকের কাছ থেকেই সঠিক পরিমাণ কর পাওয়া যাচ্ছে না এবং কর কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের কারণে অনেক সময় করদাতারা হয়রানির শিকার হন। এ ছাড়া ২০০৯ সাল থেকে ভ্যাট সংগ্রহের জন্য ইসিআর বা ফিসক্যাল ডিভাইস ব্যবহারের কথা থাকলেও গত ১৫-১৬ বছরে এ বিষয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে সংগৃহীত কর সরকারি কোষাগারে কতটুকু জমা হচ্ছে সেই প্রশ্ন তুলেন তিনি।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনাগুলো ডিসেম্বর বা জানুয়ারির মধ্যে দেওয়া উচতি। কারণ এখন বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছে এবং যে কারণে এগুলো বাজেটে প্রতিফলিত হয় না। ভবিষ্যতে প্রস্তাব দেওয়ার সময়টায় পরিবর্তন আনতে হবে।

এর আগে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ দাবি করেন, ব্যবসায়ী নানা প্রস্তাব দিলেও সেগুলো বাজেটে উঠে আসে না।

এ ছাড়া স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালেক মোহাম্মদ সায়েদ দেশে এখনো স্যানিটারি ন্যাপকিন, প্যাডের দাম বেশি। শুল্ক বেশি হওয়ার কারণে অনেকেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত