পরীক্ষার খাতায় পাওয়া জিপিএ-৫ কি একজন শিশুর শেখার গভীরতা, চিন্তা করার ক্ষমতা বা ভবিষ্যৎ দক্ষতার নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হতে পারে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও, এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। বিশ্ব যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, নতুন পেশা-দক্ষতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে বাস্তবতা, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ঠিক কী হচ্ছে সেটি অতিগুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশু ভবিষ্যতে এমন পেশায় যুক্ত হবে, যার অনেকটি এখনো স্পষ্টভাবে গড়ে ওঠেনি এমন পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম। একই সঙ্গে ইউনেস্কো বলেছে, আগামী দিনের শিক্ষার মূলশক্তি হবে অভিযোজন ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং আজীবন শেখার দক্ষতা। অর্থাৎ শুধু তথ্য জানলেই চলবে না, সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু ভাবতে ও তৈরি করতে পারাই হয়ে উঠছে আসল যোগ্যতা। এই বাস্তবতায় অনেক দেশ তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। ফিনল্যান্ড পরীক্ষার চাপ কমিয়ে, শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীল চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর এমন একটি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে। যেটি সরাসরি ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষা তখনই কার্যকর হয় যখন তা শুধু ফলাফল নয়, সক্ষমতা তৈরি করে। বাংলাদেশও একই পরিবর্তনশীল বিশ্বের অংশ। কিন্তু বাস্তব চর্চায় একটি অস্বস্তিকর ফাঁক চোখে পড়ে যেখানে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা ও দক্ষতা। সেখানে আমাদের মনোযোগের বড় অংশ এখনো সীমাবদ্ধ ফলাফল, শৃঙ্খলা আর নিয়ন্ত্রণে। এই অবস্থায় মূল প্রশ্নটি খুবই সরল, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তা হচ্ছে, আমরা কি শিক্ষাকে সত্যিই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি শুধু বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আরও কঠোর করে তুলছি?
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি শিক্ষার গুণগতমান উন্নত করার পথে হাঁটছি, নাকি শুধু পরীক্ষার ফলাফল নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলার দৃশ্যমানতা বাড়িয়ে সন্তুষ্ট থাকছি? এ প্রশ্ন কেবল নীতিগত আলোচনার বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি যুক্ত দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতার সঙ্গে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কয়েক কোটি শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ভর্তি হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও, শিক্ষার গুণগতমান নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার হলে নকলবিরোধী অভিযান, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্য বেশ ভাইরাল। শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি তদারকি, বিভিন্ন পর্যায়ের নজরদারি সব মিলিয়ে এক ধরনের ‘জরুরি নিয়ন্ত্রণের প্রদর্শনী’ তৈরি হয়েছে। নিঃসন্দেহে নকল প্রতিরোধ জরুরি, এটি শিক্ষার নৈতিক ভিত্তি রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যমান কঠোরতা কি শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরতর সংকটের সমাধান করছে, নাকি আমরা কেবল উপসর্গের চিকিৎসা করে মূল সমস্যাকে আড়াল করছি? বাস্তবতা বলছে, আমাদের শিক্ষা ক্রমে জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে, পরীক্ষাভিত্তিক ফলাফলের দিকে ঝুঁকছে। শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখন শেখার জন্য নয়, বরং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। ফলে মুখস্থনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে বোঝার চেয়ে মনে রাখাই বেশি দরকারি হয়ে উঠেছে। এর ফলে পরীক্ষায় সাফল্য থাকলেও বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো জিপিএ-৫ পাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে এই বৈপরীত্যই বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণির নিচের স্তরের পাঠ্যবইও সাবলীলভাবে বুঝতে পারে না যা শেখার গুণগত ঘাটতির স্পষ্ট নির্দেশক। শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান এখনো তথ্যকেন্দ্রিক ও একমুখী। শিক্ষক বলছেন, শিক্ষার্থী শুনছে এই একমুখী ধারায় শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রশ্ন করার সুযোগ কিংবা বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার বিকাশের পরিবেশ সীমিত। ফলে শেখা প্রাণবন্ত ও আনন্দদায়ক প্রক্রিয়া না হয়ে, পরীক্ষার প্রস্তুতির যান্ত্রিক রুটিনে পরিণত হয়েছে। এই আকাক্সক্ষা পূরণ করছে কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্বকে ধীরে ধীরে নষ্ট করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনো কোচিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে পারিবারিক শিক্ষায় বড় অংশ ব্যয় হয়, যা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নতুন শিক্ষাক্রম চালু করে সৃজনশীলতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নানা সীমাবদ্ধতা। শিক্ষকরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না, অনেক ক্ষেত্রে তারা নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। ফলে যে পরিবর্তনটি শিক্ষাকে আরও কার্যকর করার কথা ছিল, তা অনেক জায়গায় নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে। মূল সমস্যা আরও গভীরে। আমাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো পরীক্ষানির্ভর। বছরে এক বা দুটি বড় পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে, শিক্ষার্থীর সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়। এই একমাত্রিক মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করে এবং তাদের শেখার স্বাভাবিক আগ্রহকে বাধাগ্রস্ত করে। অথচ বৈশ্বিকভাবে এখন ধারাবাহিক মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা এবং বাস্তব দক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার বলছে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ, কেবল পরীক্ষায় সাফল্য নয়। শিক্ষক সংকট ও মানগত সমস্যা, সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। যারা আছেন, তাদের অনেকেই আধুনিক শিখন-পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত নন। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত। একজন শিক্ষক যদি কেবল সিলেবাস শেষ করার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকেন, তাহলে তিনি কখনোই শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল বা সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারবেন না। শিক্ষকের ভূমিকা হতে হবে ‘জ্ঞান-পরিবেশ নির্মাতা’, যিনি শিক্ষার্থীদের শেখার পথে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবেন। শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য, এই সমস্যাকে গভীর করে তুলেছে। শহরের উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক এবং সহায়ক পরিবেশ রয়েছে, সেখানে গ্রামীণ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মৌলিক সুবিধার অভাব। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, ডিজিটাল সুবিধা, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ এবং সহায়ক শিক্ষাসামগ্রীর ক্ষেত্রে এই বৈষম্য যথেষ্ট স্পষ্ট, যা শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগকে অসম করে তুলেছে। এই বৈষম্য কেবল শিক্ষার মানের পার্থক্য তৈরি করছে না, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অসমতা তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বৈশ্বিক অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এখন শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়, বরং সেই তথ্য ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এই বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং অভিযোজন ক্ষমতা তৈরি করা। কিন্তু আমাদের বর্তমান কাঠামো এখনো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি। এই অবস্থায় মূল প্রশ্নটি সামনে আসে- সংস্কারের অগ্রাধিকার কোথায়? আমরা কি কেবল পরীক্ষার সময় কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করব, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তুলব? অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা দিয়ে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এটি সাময়িকভাবে সমস্যা কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান দেবে না। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন। প্রথমত, পাঠ্যক্রমকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু তথ্য মুখস্থ না করে, বরং সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শিখতে পারে এই লক্ষ্যকে সামনে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। শুধু লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে প্রকল্প, উপস্থাপনা, দলগত কাজ এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক দক্ষতা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নকে কার্যকর ও নিয়মিত করতে হবে। শিক্ষককে যদি পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা না হয়, তাহলে কোনো সংস্কারই সফল হবে না। শিক্ষকদের জন্য এমন একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে উৎসাহিত হন এবং নিজেদের দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ পান। চতুর্থত, শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার এটা কোনোভাবেই ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাকে নম্বরনির্ভর সাফল্যের মানদ- থেকে বের করে এনে দক্ষতা, চিন্তাশক্তি এবং জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশ্বব্যাপী আলোচিত ‘লার্নিং পভার্টি’ ধারণা, যেখানে নির্দিষ্ট বয়সে শিশুরা সহজ পাঠও বুঝতে পারে না এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে এবং আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। পরীক্ষায় নকলবিরোধী অভিযান, কঠোর নজরদারি এসব উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান ফলাফল দিতে পারে। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন গভীর, সুপরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক সংস্কার। এটি সময়সাপেক্ষ এবং চ্যালেঞ্জিং অপরিহার্য।
আমরা কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চাই যা শুধু ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করে? নাকি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা ভবিষ্যৎ কাঠামো মজবুত করে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত দিকনির্দেশনা তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যমানতা, নাকি টেকসই সংস্কারের বাস্তব রূপান্তর। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে যে সংকট স্থির হয়ে আছে, তা কেবল পরীক্ষায় শৃঙ্খলা বা নকল প্রতিরোধের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। এটা মূলত দৃষ্টিভঙ্গি বা আচরণগত সংকট কিংবা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন। আমরা শিক্ষাকে কী হিসেবে দেখতে চাই, তার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়, আমরা এখনো ফলাফলনির্ভর সাফল্যের ধারণা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি, যেখানে নম্বরই হয়ে উঠেছে শিক্ষার প্রধান মাপকাঠি। দেশ তখনই এগিয়ে যাবে, যখন তার শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে চিন্তা করতে শেখাবে, প্রশ্ন করার সাহস জোগাবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম করে তুলবে। সেই জায়গায় পৌঁছাতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং শিক্ষায় সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন যেখানে পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং সুযোগের সমতা সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় আসে। তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান সাফল্যের মোহ থেকে বের হয়ে যদি আমরা শিক্ষার গভীরতর রূপান্তরের পথে হাঁটতে পারি, তবেই শিক্ষা ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করে তুলবে। না হলে নিয়ন্ত্রণের এই দৃশ্যমান প্রদর্শনী চলতেই থাকবে, কিন্তু কাক্সিক্ষত পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে।
লেখক: চাইল্ড কেয়ার, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ
