অজানা ও পৃথিবী জয়ের নেশা

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১৬ এএম

অজানাকে জানার নেশায় ঘর ছেড়ে বিশ্ব মানচিত্র বদলে দেওয়া ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রীদের সাহস ও তাদের অভিযানের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

মানুষের ভেতরে অজানাকে জানার এক অদম্য কৌতূহল চিরন্তন। সেই আদিম কৌতূহলই হাজার বছর ধরে মানুষকে ঘর ছেড়ে বের করে দিয়েছে অচেনা দিগন্তের দিকে। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানুষ কেবল নিজের আঙিনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পাহাড়ের ওপারে কী আছে কিংবা সমুদ্রের নীল জলরাশি কোথায় গিয়ে মিশেছে এই চিরন্তন প্রশ্ন তাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে। কখনো বাণিজ্যের টানে, কখনো জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণায়, আবার কখনো নিছক দুঃসাহসিক অভিযানের নেশায় এই অভিযাত্রীরা পাড়ি দিয়েছেন দুর্গম পাহাড়, উত্তাল সমুদ্র আর তপ্ত মরুভূমি। এসব ভ্রমণকারী ও অনুসন্ধানকারীরাই মূলত পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছেন এবং নির্ধারণ করেছেন মানবসভ্যতার গতিপথ। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাহসের একেকটি মহাকাব্য।

অজানার পথে তাদের এই যাত্রা শুধু ভৌগোলিক সীমানাই বাড়ায়নি, বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। মানুষের এই অন্বেষণ কেবল নতুন ভূখণ্ড দখলের গল্প নয়, বরং এটি ছিল এক মহাদেশের সঙ্গে অন্য মহাদেশের ধ্যান-ধারণা, ধর্ম ও দর্শনের আদান-প্রদান। এই অভিযাত্রীরা যখন দিগন্তের ওপারে পা বাড়িয়েছেন, তখন তারা সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন নিজ নিজ সভ্যতার পরিচয় এবং নিয়ে এসেছেন দূর দেশের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। আজ আমরা যে বিশ্বায়ন বা বিশ্বজনীন সংস্কৃতির কথা বলি, তার বীজ বপন করেছিলেন এই অকুতোভয় ভ্রমণকারীরাই। তাদের রক্ত, ঘাম আর ত্যাগের বিনিময়েই উন্মোচিত হয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি গোপন কোণ। এই যাত্রা সবসময় কেবল মসৃণ বা সুখকর ছিল না; এর সঙ্গে মিশে আছে যেমন বীরত্বের জয়গান, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে আছে ট্র্যাজেডি আর ধ্বংসের ইতিহাসও। তবুও, মানুষের এই অদম্য অনুসন্ধিৎসু মন আধুনিক বিশ্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে এবং আমাদের শিখিয়েছে যে, সীমাবদ্ধতা কেবল আমাদের চিন্তায়, সাহসে নয়। আজকের এই আধুনিক বিশ্বের গতিশীলতা আর বৈচিত্র্যের মূলে রয়েছে সেসব অভিযাত্রীদের পদচিহ্ন, যারা একসময় শূন্য হাতে অজানার পথে পা বাড়িয়েছিলেন।

মার্কো পোলো ও প্রাচ্যের বিস্ময়

ভেনিসের এক বণিক পরিবারের সন্তান মার্কো পোলো যখন তেরো শতকে সিল্ক রোড ধরে এশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন, তখন ইউরোপের মানুষের কাছে প্রাচ্য ছিল এক রহস্যময় রূপকথার দেশ। দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন কুবলাই খানের দরবারে। সেখানে তিনি দীর্ঘ সতেরো বছর অবস্থান করেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্য খুব কাছ থেকে দেখেন। পরবর্তীকালে যখন তিনি তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন, তখন সেই গ্রন্থটি ইউরোপীয়দের চিন্তাজগতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার বর্ণনা থেকে ইউরোপের মানুষ প্রথমবার জানতে পারে কাগজের মুদ্রার ব্যবহার, কয়লা পুড়িয়ে তাপ উৎপাদন এবং প্রাচ্যের উন্নত রেশম শিল্পের কথা। মার্কো পোলোর এই ভ্রমণকাহিনিই পরবর্তীকালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসসহ অনেক অভিযাত্রীকে নতুন পথ খোঁজার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি শুধু একজন পর্যটক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যের প্রথম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক দূত।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস

চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপীয় দেশগুলো যখন এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য সরাসরি সমুদ্রপথ খুঁজছিল, তখন ক্রিস্টোফার কলম্বাস এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পশ্চিম দিকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিলেই ভারতের উপকূলে পৌঁছানো সম্ভব। স্পেনের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ১৪৯২ সালে তিনি তিনটি ছোট জাহাজ নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দীর্ঘ যাত্রার পর তিনি যখন স্থলভাগের দেখা পান, তখন তিনি ভেবেছিলেন তিনি এশিয়ার কোনো দ্বীপে পৌঁছেছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি উন্মোচন করেছিলেন এক সম্পূর্ণ নতুন মহাদেশ আমেরিকা। যদিও কলম্বাসের এই আবিষ্কার পরবর্তীকালে আদিবাসীদের জন্য ট্র্যাজেডি এবং উপনিবেশবাদের সূচনা করেছিল, কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। তার এই যাত্রার ফলে আটলান্টিকের দুই তীরের মানুষের মধ্যে শস্য, প্রাণী, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির যে আদান-প্রদান শুরু হয়, তা ইতিহাসে কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জ নামে পরিচিত। এটি আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল। কলম্বাসের এই তথাকথিত আবিষ্কার বিশ্ব সভ্যতার জন্য যেমন নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল, তেমনি এর পেছনে ছিল মানব ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি। তার আগমনের পরপরই ইউরোপীয়দের দ্বারা আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর শুরু হয় নির্মম শোষণ ও দাসত্বের নিষ্ঠুর এক অধ্যায়। স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের ফলে অসংখ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী তাদের পৈতৃক ভূমি ও স্বাধীনতা হারায়। সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল ইউরোপ থেকে আগত নানা রোগব্যাধির মাধ্যমে। গুটিবসন্তের মতো রোগের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না, ফলে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় জনসংখ্যাগত বিপর্যয়।

প্রথম বিশ্বভ্রমণ

পৃথিবী যে সমতল নয় বরং গোল, এ ধারণার সবচেয়ে বড় এবং বাস্তব প্রমাণ দিয়েছিলেন ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে তিনি স্পেনের হয়ে এমন এক অভিযানে বের হন, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার নিচ দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে এশিয়ার মসলা দ্বীপে পৌঁছানো। এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও প্রাণঘাতী অভিযান। ম্যাগেলান নিজে ফিলিপাইনে একটি যুদ্ধে নিহত হলেও তার দলের অবশিষ্ট সদস্যরা এবং একটি জাহাজ শেষ পর্যন্ত সমুদ্রপথে পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে স্পেনে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। এই অভিযানের মাধ্যমেই মানুষ প্রথম জানতে পারে যে, পৃথিবীর সব সমুদ্র আসলে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত এবং আমাদের এই গ্রহের বিশালতা আসলে কতখানি। এটি মধ্যযুগের বিশ্ব পরিক্রমা।

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিখ্যাত ভ্রমণকারী ছিলেন মরক্কোর যুবক ইবনে বতুতা। মাত্র একুশ বছর বয়সে হজ পালনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি টানা ৩০ বছর ভ্রমণ করেন। তার ভ্রমণের পরিধি ছিল তৎকালীন পরিচিত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি কোণ। তিনি উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন ভ্রমণ করেছিলেন। তার ভ্রমণের মোট দূরত্ব ছিল প্রায় এক লাখ সতেরো হাজার কিলোমিটার, যা তৎকালীন যানবাহনের তুলনায় অবিশ্বাস্য। ইবনে বতুতার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও বর্ণনা। তার লেখা রেহলা গ্রন্থে তিনি সেই সময়ের বিভিন্ন দেশের সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার, রাজদরবারের রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, তা আজও মধ্যযুগের ইতিহাস জানার প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, কৌতূহল এবং ধর্মীয় আবেগ একজন মানুষকে কত সুদূরপ্রসারী পথে নিয়ে যেতে পারে।

দুই মেরুর বিজয়গাথা

যখন পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চল আবিষ্কৃত হয়ে গেছে, তখন মানুষের নজর পড়ে পৃথিবীর দুই প্রান্তের চরম শীতল ও দুর্গম মেরু অঞ্চলের দিকে। নরওয়ের দুঃসাহসী অভিযাত্রী রোয়াল্ড আমুন্ডসেন ছিলেন আধুনিক মেরু অভিযানের প্রকৃত নায়ক। ১৯১১ সালে তিনি ব্রিটিশ অভিযাত্রী রবার্ট ফ্যালকন স্কটের সঙ্গে এক কঠিন প্রতিযোগিতার পর প্রথম মানুষ হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। তার এই সাফল্যের মূলে ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি এস্কিমোদের কাছ থেকে শিখেছিলেন কীভাবে কুকুর চালিত সেøজ ব্যবহার করতে হয় এবং কীভাবে পশুর চামড়া দিয়ে শীত নিবারণ করতে হয়। শুধু দক্ষিণ মেরু নয়, তিনি উত্তর মেরু বিজয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আমুন্ডসেনের অভিযানগুলো মানবদেহের ধৈর্য এবং মানসিক শক্তির চরম পরীক্ষা ছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথ প্রশস্ত করে।

মহাকাশ যুগের সূচনা

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মানুষের অনুসন্ধানের আকাক্সক্ষা পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের দিকে প্রসারিত হয়। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল সোভিয়েত বৈমানিক ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে ভস্তক-১ মহাকাশযানে চড়ে পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেন। মাত্র ১০৮ মিনিটের সেই যাত্রা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। গ্যাগারিন শুধু একজন মহাকাশচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন অজানার পথে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তার এই সাফল্য প্রমাণ করেছিল যে, মানুষ চাইলে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল কাটিয়ে মহাকাশে বিচরণ করতে পারে। এই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় চাঁদ জয় এবং অন্যান্য গ্রহে রোবট পাঠানোর মহাযজ্ঞ। গ্যাগারিন আমাদের দেখিয়েছেন যে, মানুষের অন্বেষণের কোনো শেষ নেই এবং পুরো মহাবিশ্বই এখন আমাদের নতুন গন্তব্য।

অভিযাত্রীদের উত্তরাধিকার ও আধুনিক বিশ্ব

এই মহান ভ্রমণকারী ও অনুসন্ধানকারীরা একেকজন একেক সময়ে বাস করলেও তাদের সবার মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল অজানার প্রতি ভালোবাসা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার জেদ। তাদের কেউ কেউ হয়তো স্বর্ণ বা মসলার খোঁজে বেরিয়েছিলেন, কেউবা বেরিয়েছিলেন ধর্মের প্রসারে কিংবা নিছক বৈজ্ঞানিক তথ্যের সন্ধানে। কিন্তু তাদের সেই যাত্রার ফলে আজকের পৃথিবী অনেক বেশি সংযুক্ত। তারা ভৌগোলিক দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিয়েছেন এবং বিশ্বকে একটি একক গ্রামের রূপ দিয়েছেন। আজ আমরা যখন খুব সহজেই উড়োজাহাজে করে মহাদেশ পাড়ি দেই বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হই, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত এই সহজ পথের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন সেই আদি অভিযাত্রীরা। তাদের সাহস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সীমানা আসলে কেবল মানুষের মনে, বাস্তবে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কোনো শেষ নেই।

এই অভিযাত্রীদের জীবন থেকে আমরা শিখি যে প্রতিকূলতা জয় করাই মানুষের ধর্ম। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে মানচিত্র আমাদের উপহার দিয়েছেন, তা কেবল ভূখণ্ডের মানচিত্র নয়, বরং তা মানুষের ইচ্ছাশক্তির মানচিত্র। আজকের যুগেও যখন আমরা সমুদ্রের তলদেশ বা মঙ্গলের পৃষ্ঠতলে অনুসন্ধানী যান পাঠাই, তখন আমরা আসলে সেই কলম্বাস, ম্যাগেলান বা ইবনে বতুতাদের দেখানো পথেই এগিয়ে চলি। অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের এই মহাকাব্য চলতেই থাকবে, কারণ মানুষের কৌতূহল কখনো ফুরাবার নয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রীদের এই গল্পগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে অজানাকে জানার জন্য ঘর থেকে বের হতে এবং নিজের সীমানা অতিক্রম করতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত