আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলেই শাস্তি

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫০ এএম

দিনে দিনে অবনতির দিকে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকা-সহ বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। বৈঠকে থানা পুলিশের টহল টিমের কর্মকা- নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবারও পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিশেষ বৈঠক করে বেশকিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই মধ্যে পুলিশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়েছে যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হবে, সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাৎক্ষণিক বদলিসহ সাময়িক বরখাস্তও করা হতে পারে। পুলিশের একটি সূত্র এ কথা জানিয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এলাকায় থানা পুলিশের ঢিলেঢালা টহল হচ্ছে। রাতের বেলায় ডিউটি হয় না বললেই চলে। আবার কিছু টহল হলেও গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে রাত পার করে দেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। আন্ডারওয়ার্ল্ড আগের চেয়ে বেশি তৎপর হচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ছে। টার্গেট করে হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। চরমপন্থিদেরও অপকর্মও বেড়ে গেছে। অনেক অপরাধী ভাড়ায় খাটছে। দেশের ভেতরের পাশাপাশি বিদেশ থেকে হত্যার নির্দেশনা আসছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও আছে আতঙ্ক। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার নির্দেশ দিলেও পুলিশের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা যাচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে না লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র। ধরা পড়ছে না দাগি অপরাধী। শৃঙ্খলা আসছে না দেশে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। গত সোমবার বৈঠক শেষে পুলিশের সব কটি ইউনিটকে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। টার্গেট কিলিংয়ের তালিকায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি নেতা, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ আছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিনই খুনখারাবি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সারাদেশে অন্তত ২০ জন হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। ছিনতাইয়ের ঘটনাতো দিনের বেলাতেই হচ্ছে। সবমিলিয়ে আমরাও আছি উদ্বেগের মধ্যে। তিনি বলেন, আমরা বেশকিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা অবনতি হবে, সেখানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শাাস্তির মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস, বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত রয়েছে। এরই মধ্যে সবাইকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের ছাড় পাবে না কেউ।’ পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার পেছনে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের অনেক নেতা। তাদের উদ্দেশ্য দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ও সমাজে ভীতি-আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা।’

পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশজুড়ে পেশাদার অপরাধীদের তালিকা করে এখনই আইনের আওতায় নেওয়া জরুরি। জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। আটকের এক মাসের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পাচ্ছে অপরাধীরা। এ কারণে অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। এ সুযোগে এসব অপরাধীকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কাছে টানছে কোনো কোনো মহল। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এরই মধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অপরাধীদের তালিকা করে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলায় জেলায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বসানো হয়েছে বাড়তি তল্লাশিচৌকি। কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। সাদা পোশাকের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এরই মধ্যে অপরাধীরা বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে খুন করছে। বিকেলের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যেসব এলাকায় টহল জোরদার থাকার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকাগুলোয় পুলিশের গাড়ি শুধু মূল সড়কে সীমাবদ্ধ থাকছে, গলি বা সরু রাস্তায় পুলিশের প্রবেশ কমে গেছে। এ সুযোগে স্থানীয় অপরাধী চক্র ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে। এখনো পর্যন্ত ১ হাজার ৩২৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

জানা গেছে, ঢাকাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের সাবেক একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই অপরাধী চক্রগুলো সুযোগ নিচ্ছে। আবার নতুন করে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ার ভয়েও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন অনেক পুলিশ সদস্য। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কোনো এলাকায় যদি টহল পুলিশের অবহেলার কারণে চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটে, তবে শুধু মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল নয়, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং সার্কেল এসপিকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা দরকার। সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বা পেশাদারিত্বের ঘাটতি প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলাসহ তাৎক্ষণিক ক্লোজড (প্রত্যাহার) করার নির্দেশ দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে অপরাধ পর্যালোচনার মাধ্যমে থানাভিত্তিক র‌্যাঙ্কিং করা হবে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা শাখা (ইন্টেলিজেন্স) টহল দলের কার্যক্রম নজরদারি করতে হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নতি করতে বেশ কিছু নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এলাকায় পুলিশের টহল বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। থানায় জনবল বা যানবাহন সংকট থাকলে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। দাগি সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য অপরাধীদের আটকে বিশেষ অভিযানও চালানো হবে। প্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্লকরেইড দিয়ে অপরাধীদের নির্মূল করতে হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তির আওতায় নেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারাদেশে ৮৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে ৩১৭টি। গড়ে প্রতি মাসে খুনের ঘটনা ২৮৪টি। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ছিল ৭৫০টি। জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ২১৭ ও মার্চে ২৩৯ জন খুন হয়। গত বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৫০টি। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে ৭১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২৩১টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪০ ও মার্চে ২৩৯টি। ওই বছরের প্রথম তিন মাসে গড়ে হত্যার ঘটনা ২৩৬টি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি প্রতিরোধ করতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার সবার আগে ঠেকাতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন শীর্ষপর্যায়ের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় প্রশ্রয় না দেয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত