রোজারিওর গ্রান্দোলি ক্লাবে আজও অমলিন ছোট্ট সেই মেসি

'তার মতো আর কেউ হবে না,' বলছিল ১১ বছর বয়সী ভ্যালেন্টিন এনরিকেজ, 'আমার খারাপ লাগছে কারণ জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়টি চলে যাচ্ছে'

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

অ্যাসিসিয়েটে প্রেসের ডেবোরা রে ঘুরতে গিয়েছিলেন লিওনেল মেসির উত্থান যেখান থেকে, সেই রোজারিওর গ্রান্দোলি ক্লাবে

পারানা নদীর ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাস রোজারিও’র বিকেলে হিমেল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। ছোট ছোট শিশুদের ওয়ার্ম-আপের সময় তাদের জুতোর খটখট শব্দ আরও তীব্র হয়, যতক্ষণ না রেফারি মাঠে নামার সংকেত দিচ্ছেন।

তারা গায়ে জড়িয়েছে 'আবানদেরাদো গ্রান্দোলি'-র কমলা ও সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া জার্সি। এটি সেই পাড়ার ক্লাব, যেখান থেকে ৩৪ বছর আগে লিওনেল মেসির ফুটবলের পথচলা শুরু হয়েছিল। পাশের এক ভবন থেকে মেসির শৈশবের একটি ম্যুরাল শিশুদের বল তাড়া করার দৃশ্যটি যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো দেখছে।

হয়তো বহু বছর পর, এদেরই মধ্যে কারোর সঙ্গে তুলনা করা হবে রোজারিও’র এই বিখ্যাত সন্তানের—যিনি সর্বকালের সেরা ফুটবলার।

"আমি ছোটবেলা থেকে তাকে দেখে বড় হয়েছি এবং তার মতো খেলার ইচ্ছা জাগত," বলছিল ১১ বছর বয়সী হুলিয়ান সিলভেরা। সে বিশেষ করে মেসির ফ্রি-কিকের ভক্ত।

মেসির গৌরবময় ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি এখনও লেখা হয়নি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইন্টার মায়ামির ৩৮ বছর বয়সী এই অধিনায়ক আর্জেন্টিনার হয়ে তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করেননি। সেই গল্পের শুরুটা হয়েছিল এখানেই—আর্জেন্টিনার তৃতীয় বৃহত্তম শহর এবং শিল্পাঞ্চল রোজারিও’র একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত এলাকায়, যা বিপ্লবী আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারা-রও জন্মস্থান।

১৯৯২ সালে তার নানি সেলিয়া ৫ বছর বয়সী লিওনেলকে তার বড় ভাই মাতিয়াসের খেলা দেখাতে গ্রান্দোলিতে নিয়ে যান।

মেসি কীভাবে মাঠে নামলেন, তা এখন এই ক্লাবের লোকগাথা হয়ে দাঁড়িয়েছে: ৬ বছর বয়সীদের সাতজনের একটি ম্যাচে একজন খেলোয়াড় কম ছিল। সেলিয়া তার ছোট কিন্তু প্রতিভাবান নাতির জন্য এটি একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি কোচ সালভাদর আপারিসিও-র সাথে তাকে নামানোর জন্য তর্ক জুড়ে দেন।

"আপারিসিও তাকে নামাতে চাননি কারণ ওই বয়সের দলের তুলনায় সে অনেক ছোট ছিল," গ্রান্দোলিতে মেসির তৎকালীন সতীর্থ ইজেকুয়েল আসালেস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন। "নানি জেদ ধরেছিলেন। তারা তাকে নামিয়ে দিল এবং সবাই বলে উঠল, 'কী খেলোয়াড়!' এভাবেই সব শুরু হয়েছিল।"

গ্রান্দোলি ক্লাব সেই ছোট্ট মেসি

মেসির একমাত্র অনুমোদিত জীবনীর লেখক স্প্যানিশ সাংবাদিক গিলেম বালাগ-এর মতে, কোচ ভেবেছিলেন ছোট ছেলেটির জন্য খেলাটি খুব কঠিন হয়ে যাবে, যে কি না ইতিমধ্যে শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যার লক্ষণ দেখাচ্ছিল। তিনি মেসিকে ডান উইংয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে সে তার নানির কাছাকাছি থাকতে পারে।

বালাগ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, আপারিসিও ওই নারীকে বলেছিলেন, "যদি দেখেন সে কাঁদছে বা ভয় পাচ্ছে, তবে তাকে তুলে নেবেন।"

২০০৮ সালে মারা যাওয়া আপারিসিও বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে বর্ণনা করেছিলেন যে, প্রথমবার বল পাওয়ার পর মেসি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। কিন্তু পরের বারেই তিনি বাম পায়ে বল রিসিভ করে একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে এগিয়ে যান। জন্ম নেয় এক কিংবদন্তি।

তরুণ মেসিকে দেখে ফুটবল ভক্তরা দেখেছিলেন 'নতুন ম্যারাডোনা'

আর্জেন্টিনায় তথাকথিত "বেবি ফুটবল" ক্লাবগুলো ৪ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।

কিশোরদের যুব দলগুলোর মতো তারা খেলোয়াড় বিক্রির ট্রান্সফার ফির কোনো অংশ পায় না। বিশ্বজুড়ে অনেক ক্লাব পেশাদার হওয়ার আগে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের গড়ে তোলার জন্য এই 'সলিডারিটি পেমেন্ট' পায়, যা আয়ের বড় উৎস।

গ্রান্দোলি ক্লাবের শিশু ফুটবলাররা

পরিবর্তে, তারা পরিবারের দেওয়া মাসিক ফি এবং ম্যাচ চলাকালীন টিকেট বিক্রির ওপর নির্ভর করে। গ্রান্দোলির ক্ষেত্রে, ক্লাবটি মেসির খ্যাতি কাজে লাগিয়ে এনার্জি ড্রিঙ্ক এবং বিয়ার ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন থেকে অতিরিক্ত আয় করতে সক্ষম হয়েছে।

ক্লাবের ছোট লকার রুমে ট্রফি এবং মেসির যুব দলের ছবিসহ একটি ডিসপ্লে কেস রয়েছে, যা এই বা পায়ের জাদুকরের ক্লাবে কাটানো সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং সেখানে প্রশিক্ষণরত প্রায় শতাধিক শিশুর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

"সে ছিল অন্যরকম এক খেলোয়াড়; আপনাকে শুধু তাকে বলটা দিতে হতো এবং তাকে সমর্থন করতে হতো। তখনই বোঝা যেত তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল," স্মৃতিচারণ করেন আসালেস, যার নিজের দুই ছেলেও এখন এই ক্লাবে খেলছে। "সে তিন-চারজন খেলোয়াড়কে অনায়াসেই কাটিয়ে চলে যেত। আমরা রিবাউন্ডের জন্য অপেক্ষা করতাম, অথবা সে নিজেই গোল করত।"

গোলের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে সপ্তাহান্তে মাঠে দর্শকের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। সবাই সেই ‘নতুন ম্যারাডোনা’কে দেখতে আসত, যার জন্ম হয়েছিল ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয়ের ঠিক এক বছর পর।

"বাকি বিশ্ব তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখার সুযোগ পেয়েছে, আর আমরা ভাগ্যবান যে শুরু থেকেই তাকে দেখতে পেরেছি। সে ছিল অসাধারণ," বলেন গ্রান্দোলির অন্যতম কোচ ডেভিড ট্রেভেস, যিনি ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৭ বছর ধরে এর সভাপতি ছিলেন।

ট্রেভেস বলেন, "তার অবিশ্বাস্য গতি এবং বল নিয়ন্ত্রণ ছিল। তখন মাঠ বিশেষ কিছু ছিল না, শুধুই ধুলোবালি। তার কারিগরি দক্ষতা তার শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অদৃশ্য করে দিয়েছিল।"

গ্রান্দোলি থেকে বিশ্বকাপ

৭ বছর বয়সে মেসি রোজারিও’র অন্যতম জনপ্রিয় ক্লাব ‘নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ’-এ যোগ দেন। যখন ক্লাবটি তার গ্রোথ হরমোনের ঘাটতির চিকিৎসার খরচ দিতে অস্বীকার করে, তখন মেসি পরিবার স্পেনে পাড়ি জমায়। সেখানে বার্সেলোনা এই ১৩ বছর বয়সী বিস্ময় বালককে তাদের একাডেমিতে স্বাগত জানায় এবং চিকিৎসার খরচ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

বার্সেলোনা, প্যারিস সেন্ট জার্মেইন এবং এখন ইন্টার মায়ামির হয়ে অগণিত ট্রফিতে ঠাসা ক্যারিয়ারে মেসি আর কখনো গ্রান্দোলিতে ফিরে আসেননি। কিন্তু তার কিছু আচরণ এখনও তাকে সেই শুরুতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

গোলের পর মেসি দুই তর্জনী দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করেন তার নানির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, যিনি ১৯৯৮ সালে মারা যান এবং যাকে তিনি ফুটবল শুরু করার কৃতিত্ব দেন।

গোল করার পর এভাবেই নানীকে শ্রদ্ধা জানান মেসি

২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আবেগঘন বার্তা দিয়েছিলেন: "গ্রান্দোলি থেকে কাতার বিশ্বকাপ, প্রায় ৩০ বছর কেটে গেছে। প্রায় তিন দশক ধরে এই বল আমাকে অনেক আনন্দ এবং কিছু দুঃখ দিয়েছে। আমি সবসময় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম এবং চেষ্টা থামিয়ে দিতে চাইনি।"

এই বার্তাটি তার শৈশবের ক্লাবের নজরে এড়ায়নি। মের এক হিমেল বিকেলে ফুটবল খেলা শিশুদের জার্সিতে লেখা রয়েছে সেই বাক্যটি—"গ্রান্দোলি থেকে কাতার বিশ্বকাপ।"

রেফারি শেষ বাঁশি বাজালেন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন কাটলেট স্যান্ডউইচের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে শিশুরা মাঠ ছেড়ে ক্লাবের স্নাক বারের দিকে ছুটে গেল।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসায় গ্রান্দোলির কিশোর খেলোয়াড়রা—বাকি আর্জেন্টিনার মতোই—মেসির অপেক্ষায় আছে, যাতে তিনি শেষবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নেতৃত্ব দেন।

"তার মতো আর কেউ হবে না," বলছিল ১১ বছর বয়সী ভ্যালেন্টিন এনরিকেজ। "আমার খারাপ লাগছে কারণ জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়টি চলে যাচ্ছে।"

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত