ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ইউরোপ

আপডেট : ১৮ মে ২০২৬, ০২:১৫ এএম

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনা থমকে থাকায় একদিকে যেমন নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তাও ক্রমশ দানা বাঁধছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ মুক্ত করতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বা পারস্য উপসাগরে নৌঅভিযানের পরিকল্পনা নিলেও আদতে সেটিকে ব্যর্থই বলা যায়। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি দিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। গত শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের তত্ত্বাবধানে একটি ট্রানজিট ব্যবস্থার আওতায় পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের জাহাজ হরমুজ ও লারাক দ্বীপের দক্ষিণ রুট দিয়ে এই প্রণালি পার হওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলো এই আলোচনায় অংশ নিল। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি ‘পেশাদার পদ্ধতি’ চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। আজিজি জানান, এই প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ‘ইরানের সঙ্গে সহযোগিতাকারী’ পক্ষগুলোর জন্য প্রযোজ্য হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সামুদ্রিক পরিষেবার জন্য তেহরান নির্দিষ্ট ফি বা শুল্ক আদায় করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পারস্য উপসাগরে নৌঅভিযানের সঙ্গে জড়িত যেকোনো দেশের জন্য এই রুট বন্ধই থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে ইরান। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে হওয়া মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে সম্পন্ন হয়। পরে ওয়াশিংটনও ইরানি বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে। ওয়াশিংটন যতক্ষণ না হরমুজে তাদের নৌঅবরোধ প্রত্যাহার করছে এবং ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে; ততক্ষণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে তেহরান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক আলোচনার মূল বিষয় ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়টি আপাতত স্থগিত রেখে, দুই পক্ষই এই নৌপথ সচল করা এবং নৌঅবরোধ প্রত্যাহারের আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে।

এদিকে, থমকে যাওয়া শান্তি আলোচনায় গতি আনতে ইরান সফরে গিয়েছেন মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান টানা চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মহসিন নাকভি গত শনিবার দুই দিনের সরকারি সফরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে পৌঁছেছেন। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি তাকে স্বাগত জানান। কয়েক দিন আগেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরান সফর করেছিলেন। তবে গতকাল রবিবার ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের দেওয়া পাঁচ শর্তের জবাবে বিপরীত নিজস্ব পাঁচটি শর্ত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বলছে, দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে এটি প্রয়োজনীয়।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ভূখণ্ডে বোমা হামলায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া ওয়াশিংটনের দাবি, ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নিতে হবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র মাত্র একটি কার্যকর পারমাণবিক স্থাপনা রাখতে পারবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের জব্দ করা সম্পদের ২৫ শতাংশের বেশি মুক্ত করতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে বলেও স্পষ্ট করেছে ওয়াশিংটন। ফার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা (বিশেষ করে লেবাননে)। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া। সূত্রটি আরও জানায়, যুদ্ধবিরতির পরও আরব সাগর-ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের অবিশ্বাস আরও বেড়েছে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে এমন বার্তাই পাঠিয়েছে ইরান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত