দেশে বাড়ছে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বিবাহিতদের তুলনায় অবিবাহিত এইডস রোগী বাড়ছে। তবে এখনো শনাক্ত রোগীদের বেশিই বিবাহিত। এ ছাড়া সমকামীদের আক্রান্তের হারও বেড়েছে অনেক। কিন্তু দেশে এইডস শনাক্তে নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। আক্রান্তদের বড় একটা অংশ থেকে যাচ্ছে শনাক্তের বাইরে। এদিকে আজ সারা বিশ্বে বিশ্ব এইডস টিকা সচেতনতা দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেশে নেওয়া হয়নি কোনো কার্যক্রম। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি জানেনও না।
প্রতি বছর ১৮ মে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো এইচআইভি সংক্রমণ এবং এইডস প্রতিরোধের জন্য একটি নিরাপদ ও কার্যকর টিকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ১৯৯৭ সালের ১৮ মে মরগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এক সমাবর্তন বক্তৃতায় এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে কার্যকর টিকা উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান। পরের বছর ১৮ মে থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. জুবাইদা নাসরিন বলেন, ‘এই দিবস নিয়ে আমাদের কোনো কার্যক্রম নেই। এইডস টিকা নিয়ে আমাদের কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) হলো এমন একটি ভাইরাস যা দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। এই সংক্রমণের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়ে অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম (এইডস) দেখা দেয়।
এইচআইভি সংক্রমণের কোনো নিরাময় নেই। বর্তমানে এর চিকিৎসা করা হয় অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির (এআরটি) মাধ্যমে, যা শরীরে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি রোধ করে এবং একজন ব্যক্তির রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। বিশ্বে বিভিন্ন দেশে এইচআইভি/এইডসের টিকা নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা গবেষণা চলছে। তবে কার্যকর টিকা আবিষ্কার হয়নি। গবেষকরা আশাবাদী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এইডস প্রতিরোধে কার্যকর টিকা আবিষ্কারে বড় অগ্রগতি আসতে পারে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে শনাক্ত হয় ১ হাজার ৪৩৮ জন। ২০২৫ সালে শনাক্ত হয় ১ হাজার ৮৯১ জন। ২০২৫ সালে এইডস আক্রান্তদের ৪২ দশমিক শূন্য চার শতাংশ অবিবাহিত। আগের বছর এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে এটা ছিল ১৯ শতাংশ। ওই বছর বিবাহিত ছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিতদের ১০ শতাংশ বেশি; ৫২ দশমিক ৪৬ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। এইডস শনাক্তদের ৬২.৬১ শতাংশ ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২১.০৫ শতাংশ। ১০-১৪ বছর বয়সী ০.৬৯ শতাংশ। ৫ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ১. ৯৬ শতাংশ।
এইডস/এসটিডি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষ সমকামীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২০১৭ সালে ছিল ০.৭ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশনের (এএইচএফ) কান্ট্রি ডিরেক্টর আকতার জাহান শিল্পী জানান, আক্রান্তদের ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী। এছাড়া প্রবাসী ১২ শতাংশ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১১ শতাংশ, শিরায় মাদকগ্রহণকারী ৬ শতাংশ, নারী যৌনকর্মী ও হিজড়া ১ শতাংশ করে। এছাড়া ২২ শতাংশ অন্যান্য মানুষ।
দেশে প্রথম ১৯৮৯ সালে এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। প্রথম মৃত্যু হয় ২০০০ সালে। এখন পর্যন্ত অনুমিত এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ১৭ হাজার ৪৮০। এরমধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩ জন। সংক্রমণের হার .০১ শতাংশ। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ চিকিৎসার আওতায় এসেছেন অর্থাৎ শনাক্তের ৭৪ শতাংশ।
দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার সুযোগ নেই। ফলে বহু মানুষ রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিমানবন্দরেও নেই পরীক্ষা ব্যবস্থা। অনেকেই বিদেশ থেকে আক্রান্ত হয়ে এলেও নেই শক্ত নজরদারি। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি বলেন, বিমানবন্দরে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খুব বেশি সময় লাগে না। যেসব দেশে এইডস বেশি সেখান থেকে যারা আসবে, তাদের জন্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তারা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় স্যাম্পল দিয়ে যাবে। তাদের কন্ট্রাক্ট নম্বর রেখে দেবে। পরীক্ষার রেজাল্ট মোবাইলে তাদের জানিয়ে দেবে। কেউ আক্রান্ত হলে তাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং তার দ্বারা অন্য কেউ যাতে আক্রান্ত না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েরর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এইডসে এখন আর নিশ্চিত মৃত্যু নয়। ১৯৮৪ সালে শনাক্ত হওয়া রোগীও এখন সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। সঠিক চিকিৎসায় এটি এখন ডায়াবেটিসের মতোই নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বর্তমানে এমন ইনজেকশনও বের হয়েছে যা বছরে একবার নিলেই সারা বছর ভালো থাকা যায়।