সরকারিতে সুসংবাদ বেসরকারিতে কী

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০১:২৭ এএম

আকস্মিক বা আচানক কোনো কিছু না ঘটলে ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন পে-স্কেল, নবম জাতীয় বেতন কাঠামো। সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে এটি বহুল প্রতীক্ষিত। সরকারিদের বেতন-ভাতা সরকার বাড়াবে এটাই নিয়ম। বেসরকারিদের  বেতন-ভাতা সরকারের কাজ নয়। সরকারিদের বেতন-ভাতা বাড়াতে গিয়ে আর্থিক চাপ কেবল সরকারকে নিতে হয় না। ভুগতে হয় বেসরকারিসহ দেশের সবাইকে। তাই আর্থিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায়, নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা রয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলেছে সমানে। এত আলোচনা অবশ্যই দেওয়ার জন্য, না দেওয়ার জন্য নয়। নতুন পে-কমিশনের আওতায় প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনার আর্থিক সুবিধা পাবেন। সরকারি চাকরিজীবীদের সংগঠনগুলো বলছে, ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে। বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা চাপে রয়েছেন। তাই তারা দ্রুত জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে, দেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল চালু হয়। এরপর ২০১৫ সাল পর্যন্ত আটবার নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতি ৫ বছর অন্তর নতুন বেতন কাঠামো চালুর নিয়ম থাকলেও করোনা মহামারী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও রাজস্ব চাপে তা পিছিয়ে যায়। হিসাব বলছে, নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের বেতন সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয় গ্রেডে সম্ভাব্য বেতন ধরা হয়েছে, ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা এবং চতুর্থ গ্রেডে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া পঞ্চম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্তও উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দশম গ্রেডে সম্ভাব্য বেতন, ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং একাদশ গ্রেডে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। আলোচিত এই পে-স্কেলের কাজ শুরু হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ বিষয়ক চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের জুলাইয়ে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। এর ছয় মাসের মধ্যেই কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়। এতে রয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা গ্রেডভেদে ১০০ শতাংশ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ। বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান নির্ধারণ এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা। এ বিষয়ে বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া, বেসামরিক প্রশাসন, জুডিশিয়াল সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরর জন্যও একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে। কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আয় না বাড়লেও, প্রতি বছরই সরকারি ব্যয়ের আকার বাড়ছে। বেতন-ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ বৃদ্ধির কারণে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়।

অন্যদিকে, এর বিপরীতে কমে যাচ্ছে উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয়। এ অবস্থায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি খরচ করা হলে, সরকারের ব্যয় সক্ষমতা আরও সংকুচিত হবে। বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ নিতে হবে। বিদ্যমান বেতন কাঠামো অনুসারে, সরকারের সচিব ও সমমর্যাদার কর্মচারীদের জন্য প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকার মূল বেতন নির্ধারিত রয়েছে। নতুন বেতন স্কেলে এ বেতন বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমান বেতন স্কেলে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারী, ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল বেতন এবং বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে মোট ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। প্রস্তাবিত নতুন বেতন স্কেল অনুসারে, ২০ গ্রেডের একজন কর্মচারী ২০ হাজার টাকা মূল বেতন ও ভাতা মিলিয়ে ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা পাবেন। কমিশনের প্রতিবেদনে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি, সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেশ কিছু নতুন সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরের ভাতাগুলো পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন। রাজস্ব আহরণের মাধ্যমে যে আয় আসে, সেটি থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যয় মিটিয়ে থাকে সরকার। যদিও প্রতি বছর যে পরিমাণ রাজস্ব আয় হয় সেটি দিয়ে সরকারের পুরো ব্যয় দূরে থাক, পরিচালন ব্যয়ই মেটানো সম্ভব হয় না। ফলে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হয় সরকারকে। গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর বিপরীতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়। বর্তমানে সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা, পেনশন ও ঋণের সুদ পরিশোধে। অর্থ বিভাগের তথ্য বলছে, সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। এর মধ্যে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা পরিচালন খাতে এবং ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশ গেছে পরিচালন ব্যয়ের পেছনে।

সরকারের গত পাঁচ অর্থবছরের ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। বিপরীতে কমছে উন্নয়ন ব্যয়। উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়লে, সেটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। ফলে উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমে গেলে, কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাড়তি বেতন-ভাতা বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমপিও খাতের বেতন-ভাতার আর্থিক চাপ পড়বে সরকারের ওপর। বেসরকারিরাও চাপে পড়বে। তারা চাপ ফেলবে বেসরকারি সেক্টরে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি অবধারিত। নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই দফায় দফায় চড়ছে। বাজারে সরকারি-বেসরকারি আলাদা রেট নেই। বিদ্যমান বেতন কমিশন গঠনের ১২ বছর আগে ২০১৩ সালে সর্বশেষ বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ গ্রেডে ৯৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে ১০১ শতাংশ মূল বেতন বাড়িয়েছিল সরকার। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এরপর আর কোনো বেতন কমিশন গঠন করা হবে না। এর পরিবর্তে প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতীতেও বেতন-ভাতা একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছিল। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হলে, এর সঙ্গে সংগতি রেখে পেনশনভোগীদের ভাতার পরিমাণও বাড়ে।

প্রতি বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীরা যাতে ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারেন এবং কাজে মনোযোগ দিতে পারেন। স্বাভাবিক প্রশ্ন, বেসরকারিদের কি ভালোভাবে জীবনযাপনের কথা ভাবতে মানা? অবশ্যই প্রাইভেট সেক্টরে বেতন বাড়ানো সরকারের কাজ নয়। আবার তারা বেদরকারিও নয়। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অবদান সরকারি খাতের মতোই অপরিহার্য। সরকারি চাকরির তুলনায় বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ ও কর্মসংস্থান অনেক বেশি। বেসরকারি চাকরি হলো ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, করপোরেট কোম্পানি, স্টার্টআপ বা বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করা। এটি বেকারত্ব দূরীকরণে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ব্যবসা, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ ও বহুজাতিক কোম্পানিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে অবদান রাখছে তারা। বেসরকারি খাত থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ও কর দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করে।

রাষ্ট্রের একার পক্ষে সব নাগরিকের কর্মসংস্থান ও মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। দেশে দীর্ঘদিন থেকে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির এবং রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় রাজস্ব সংগ্রহে চাপ বাড়ছে। এ বাস্তবতার মধ্যে সরকারি বেতন-ভাতা বাড়াতে হচ্ছে। তা উপেক্ষার সুযোগ নেই। বেসরকারিদের অগ্রাহ্য করা বা বেদরকারি ভাবা যায় না। সেইক্ষেত্রে বেসরকারি সেক্টরের বিকাশ ও কর্মসংস্থানের আবহ তৈরি করার দায়িত্ব সরকারেরই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেতন-মজুরি না বাড়ায় বেসরকারি সেক্টরে মালিক-কর্মচারী উভয়ই দুর্দশায় ভুগছে। নিয়োগ, চাকরি টিকে থাকা, মাস শেষে বেতনসহ আনুষঙ্গিক চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা টিকে থাকলেই তো এ সেক্টরে নিয়োগ ও তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পর্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত