চাষে ইউরিয়া সার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। কিন্তু গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে মাঠ পর্যায়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যবহারের ফলে এই সারের ব্যাপক অপচয় ঘটে। কৃষি জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে ইউরিয়া সারের বড় একটা অংশ অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে বায়ুমণ্ডলে উবে যায়। এই সমস্যা সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি গবেষকরা কাজ করছিলেন। অবশেষে মিলেছে গ্রহণযোগ্য সমাধান, যা কমাবে কৃষকের ব্যয়; রক্ষা করবে পরিবেশ। লিখেছেন সুমন গাজী
কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ। আর এই বাড়তি চাপ সরাসরি এসে পড়ছে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনের ওপর। এই কৃষিতে শস্য উৎপাদনে ইউরিয়া সার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। কৃষকরা অন্যান্য সারের তুলনায় এটির ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে মাঠ পর্যায়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে ইউরিয়া প্রয়োগে ব্যাপক অপচয় ঘটে। কৃষিক্ষেত্রে সার বা জৈব পদার্থে থাকা নাইট্রোজেন যখন অম্লীয় বা ক্ষারীয় মাটিতে আর্দ্রতার কারণে অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে বায়ুম-লে উবে যায়। মাঠে প্রয়োগ করা সারের উল্লেখযোগ্য অংশ বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ায় গাছ গ্রহণ করতে পারে না। আবার কিছু অংশ মাটির নিচে লিচিং হয়ে পানিদূষণ ঘটায় কিংবা গ্রিন হাউজ গ্যাস হিসেবে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। এর ফলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে পরিবেশ ঝুঁকিতে পড়ে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য
কৃষিবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছিলেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এর সমাধানে উদ্ভাবন করেছেন ইউরিয়া সারেরই একটি বিশেষ রূপ ন্যানো ইউরিয়া। যার প্রয়োগ কৃষিতে এক বিপ্লব সৃষ্টি করবে বলে আশা করছেন তারা। ন্যানো ইউরিয়া গবেষণার এই গবেষক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষিতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসান। অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ খোরশেদ আলম, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বিএইসি) সিএসও ড. শেখ মনজুরা হক, বাকৃবির মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহসিনা শারমিন হক, পিএইচডি ফেলো মো. আমজাদ হোসেন এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান রিপন।
তাদের উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো-ইউরিয়া সার মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে সফলতা দেখিয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক দল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) পরিচালিত মাঠ পরীক্ষণে তাদের ন্যানো-ইউরিয়া ব্যবহার করেন এবং তাতে প্রাথমিক সফলতা পেয়েছেন। বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ
ন্যানো-ইউরিয়া সার
বাতাসের সঙ্গে মিশে যাওয়া প্রতিরোধ করতে গবেষকরা প্রথমে ইউরিয়া সারের কণাকে ন্যানো আকারে (প্রায় ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটার) রূপান্তর করেছেন। এরপর বায়োচার (কার্বন) দ্বারা আবৃত করেছেন। যা ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন মুক্ত করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে।
প্রাথমিক সফলতা লাভ
ন্যানো-কার্বনকোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া অপচয় ও গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। উদ্ভাবিত এই ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম ইউরিয়া সার ব্যবহার করেও সমপরিমাণ বা অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব। যা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ধানের ফলন ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ফসলের গুণগত মান উন্নয়নের সম্ভাবনাও লক্ষ করা গেছে।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ খায়রুল হাসান বলেন, ‘প্রতি বছর সরকারকে ইউরিয়া সারে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়। কৃষকরাও সবচেয়ে বেশি ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন। যা নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা দেখা দেয়। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সারের খরচ কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে আমরা গবেষণার কাজ শুরু করি। প্রাথমিকভাবে আমার যে অনুমান ছিল সেই অনুমানে মাঠ পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে আমরা সফল। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু পরীক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলতে পারব যে, আমাদের উদ্ভাবিত এই ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি কতটুকু সফল হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী আগামী মৌসুমেই এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে পারব। এটি যদি বৃহত্তর পরিসরে উৎপাদন করা যায় এবং মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করা যায় তবেই এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। বিশেষত বাংলাদেশে ধান চাষের জন্য এই ন্যানো ইউরিয়া সার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পিএইচডি ফেলো আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ন্যানো-ইউরিয়া সিনথেসিস এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে আমরা সফল হয়েছি। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে আমরা প্রায় সাফল্যের পথে। যদি ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ফলন সমানও থাকে তবুও আমরা সফল বলব। কারণ প্রথাগত ইউরিয়া তিন বার দিতে হয় কিন্তু ন্যানো একবারে দিয়ে হবে। যেহেতু বায়োচার আকারে দেওয়া হয়, এতে কার্বন এমিশন কম হবে। মাটির গুণাগুণ সমৃদ্ধি হবে, উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে।’
কৃষিবিজ্ঞানীদের অভিমত
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের এই উদ্ভাবনে কৃষিতে বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা।
এ বিষয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মো. মনোয়ার করিম খান বলেন, ‘এখানে ৮০ শতাংশ ন্যানো-ইউরিয়া আর ১০০ শতাংশ প্রিলড ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। যদি দুটোর ফলাফল যাচাই করি, তাহলে দেখতে পারব উভয়ই প্রায় একই রকম ফলন দিচ্ছে। যদি ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ ইউরিয়ার মতোই ফলন পাই তাহলে এটাকে প্রিলড ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারব। এটি কৃষকদের জন্যও অনেক সাশ্রয়ী হবে।’
ব্রি’র গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষণে দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ ইউরিয়া সারের চেয়ে তিনগুণ কম ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করেই আমরা কাক্সিক্ষত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারছি। সাধারণ ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে ধান ক্ষেতের মাটি থেকে যে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরিত হয়, ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই নিঃসরণ কমিয়ে আনছে। এতে একটি নির্মল পরিবেশ ও সাশ্রয়ী কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলবে।’
লেখক : শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, কৃষি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
