এটা অভাবনীয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কর্মরত ব্যক্তিদের ওপর বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ হামলা হচ্ছে। স্থানীয়রা প্রবণতা অনুযায়ী এসব ঘটনাকে ‘মব’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। মূলত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে, এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিরা বাধা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশ রূপান্তরে ২৩ মে প্রকাশিত ‘আক্রান্ত পুলিশ শঙ্কিত মানুষ’ শিরোনামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদক কারবারিদের হামলায় সিলেট ও চট্টগ্রামে পুলিশ ও র্যাবের দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। আমরা মনে করি, এসব হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কারণ, পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুধু পুলিশের ওপর গত ১৬ মাসে ৮১৪টি হামলা হয়েছে। চলতি বছরের চার মাসেই ঘটেছে ২১৩টি হামলা। বিস্ময়ের বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যেখানে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীসহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ওপর চড়াও হওয়ার কথা, সেখানে বাহিনীর সদস্যরাই আক্রান্ত হচ্ছেন! এমনকি থানা থেকে আসামি ছাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমন হামলায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্রমবর্ধমান এই হামলার পেছনে বেপরোয়া মনোভাব কাজ করছে।
কেন সংঘবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠী পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার বিষয়ে বেপরোয়া? ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য হতোদ্যম হয়ে পড়েন। এরপর শৃঙ্খলা অনেকটা ফিরে পেলেও, সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পুরোপুরি পালনের সামর্থ্য তারা দেখাতে পারছেন না। এতে কি পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সাহসের অভাব দেখছে দুর্বৃত্তরা? মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ, আইনের শাসন কায়েমে পুলিশকে সাহস ও শক্তি জোগাচ্ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না। কেন? এসব হামলা কি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে? কেউ পুলিশ ও র্যাবের মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে? সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এসব হামলার পেছনে ইন্ধন জোগাচ্ছে? তাহলে কি ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক শক্তি, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিরা একই ঐক্যে মিলেছে। তা না হলে, পুলিশের ওপর হামলার সাহস তাদের কোত্থেকে পায়? পুলিশের ওপর হামলার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা থেকে সামাজিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে কারা লাভবান হতে পারে? অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হামলাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
প্রকৃত অর্থে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বাহিনীগুলোকে পূর্ণ শৃঙ্খলায় এনে সাহস ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। প্রতিটি হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে হবে। যে দলেরই লোক হোক, যার ছত্রছায়ায়ই থাকুক না কেন, হামলাকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। কাউকে ছাড় না দেওয়ার দৃঢ়তা পুলিশ ও র্যাবের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং সাহস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দৃঢ়ভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কর্তব্যরত সদস্যদের সহায়তা দিতে এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয়ভাবে তাদের পাশে সামাজিক নেতৃত্ব ও মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকতে হবে। আর পুলিশ ও র্যাবকে কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে, তারা আসলেই জনগণের বন্ধু।
