চট্টগ্রামে পশুর হাটে ক্রেতা কম, বিক্রি শেষ অ্যাগ্রোতে

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৭:০০ এএম

চট্টগ্রামে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশুর হাট শুরু হলেও এখনো বেচাবিক্রি শুরু হয়নি। হাটে আশানুরূপ ক্রেতার দেখা মিলছে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাটে শত শত গরু নিয়ে অপেক্ষা করলেও কাক্সিক্ষত দামে বিক্রি হচ্ছে না পশু। অন্যদিকে অনলাইনে বা আগাম বুকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাগ্রো খামারগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। বেশিরভাগ এগ্রো ফার্মই তাদের অধিকাংশ পশু এরই মধ্যে বিক্রি করে ফেলেছে।

গতকাল রবিবার নগরের একাধিক হাট ও অ্যাগ্রো ফার্ম ঘুরে দেখা যায়, হাটগুলোতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ট্রাকে ট্রাকে গরু নিয়ে আসছেন ব্যাপারীরা। হাটে প্রচুর গরু উঠলেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। যারা আসছেন, তাদের বেশিরভাগই দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। বিক্রেতাদের দাবি, পশু পালনের খাবার, ওষুধ ও শ্রমিক খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে গরুর দাম কিছুটা বেশি। কিন্তু ক্রেতারা সেই দাম দিতে চাচ্ছেন না।

নগরীর নূরনগর হাউজিং সোসাইটির এক কিলোমিটার হাটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে আসা ব্যাপারী আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৮টি গরু নিয়ে হাটে দুই দিন ধরে আছি। নিজের খরচ, সঙ্গের মানুষের খরচ, গরুর খরচ সবই হচ্ছে কিন্তু গরু বিক্রি হচ্ছে না। দাম শুনেই মানুষ চলে যাচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতাও অনেক কম।

একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন সাগরিকা গরু বাজারের ব্যাপারী শফিক। তিনি বলেন, রাজশাহী থেকে মাঝারি মানের ২১টি গরু নিয়ে এলাম। খামারে এক বছর ধরে গরু লালন-পালন করেছি। খাবারের দাম বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। এখন কম দামে বিক্রি করলে লোকসান হবে। ক্রেতাকে দাম বললে কোনো উত্তর না দিয়েই চলে যাচ্ছে।

সাগরিকা হাটে গরু কিনতে আসেন মাহমুদ নামের এক ক্রেতা। দীর্ঘক্ষণ হাটে ঘুরে ক্রয়সীমার মধ্যে গরু না পেয়ে অন্য হাটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আলাপকালে তিনি বলেন, বাজারে অনেক গরু আছে। কিন্তু কী কারণে ব্যাপারীরা এত দাম চাচ্ছেন তা বুঝতে পারছি না। গত বছর যে গরু কিনতে খরচ হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এবার একই বা কাছাকাছি মানের গরুতে চাচ্ছে দেড় থেকে দুই লাখেরও বেশি। চাইলেই তো বাজেট বাড়িয়ে কিনতে পারি না।

কোরবানির পশু বিক্রিতে স্বস্তিতে রয়েছেন এগ্রো খামারিরা। বিশেষ করে যারা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আগাম বুকিং নিয়েছেন, তারা এরই মধ্যে অধিকাংশ পশু বিক্রি করে ফেলেছেন। খামারিরা বলছেন, এখন অনেক ক্রেতাই হাটের ভিড় এড়িয়ে সরাসরি খামার থেকে পশু কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন।

চট্টগ্রামের চৌধুরী র‌্যাঞ্চের স্বত্বাধিকারী রাশেদ মোহাম্মদ চৌধুরী জানান, এবার  কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তারা ১৩৩টি নানা আকারের গরু প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে ১২৬টিই বিক্রি হয়ে গেছে। এবার পশুর হাটের দামের চেয়ে অনেক কম মূল্যে তারা গরু বিক্রি করছেন বলে সাধারণ মানুষ আগেভাগেই এগ্রো থেকে গরু কিনেছেন।

তিনি বলেন, আগে মানুষ হাট থেকে গরু নিয়ে রাখতে, পালন করতে সমস্যায় পড়তেন। গরু অসুস্থ হলে কিছু বলার সুযোগ ছিল না। আমরা যারা এগ্রোর সঙ্গে জড়িত তারা সবাই নিজ নিজ ফার্মে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও লোক নিয়োগ দিয়েছি। এতে করে গরু বিক্রির পরও কোনো সমস্যা হলে আমরা চিকিৎসাসহ অন্যান্য সার্ভিস দিতে পারি। তাই মানুষ ভরসা করেই এগ্রো থেকে গরু কিনছেন। এ ছাড়া কোরবানির একদিন আগে ডেলিভারির সুবিধা থাকায় নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন ক্রেতারা।

এশিয়ান এগ্রোর ম্যানেজার রায়হান জানান, এ বছর ২৫০টি কোরবানিযোগ্য গরু তুলেছিলেন। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ বিক্রি হয়ে গেছে। দাম সহনীয় থাকায় ক্রেতারা ফেরত যাননি।

কেন সাধারণ মানুষ হাটবিমুখ হয়ে এগ্রো থেকে গরু কিনছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের এগ্রোতে সারা বছর গরু লালন-পালন করি। সাধারণ মানুষ যেকোনো সময় এসে দেখতে পারেন। এতে একটা আস্তা তৈরি হয়েছে। ক্রেতারাও নির্ভরযোগ্য খামার থেকে স্বাস্থ্যসম্মত পশু কিনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

মুরাদপুরের এক খামারি জানান, ফেসবুক পেজে গরুর ছবি ও ভিডিও আপলোড করেছেন। সেখান থেকেই অনেক অর্ডার এসেছে। প্রায় সব গরু বিক্রি হয়ে গেছে। হাটে নেওয়ার প্রয়োজনই হয়নি।

এক কিলোমিটার হাটের ইজারাদার ছোটন বলেন, আমাদের হাটে পর্যাপ্ত গরু আছে। দুই একদিনের মধ্যেই বেচাকেনা বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, আশপাশে এলাকাভিত্তিক হাট বসার কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। আমরা প্রশাসনকে বলেছি, এসব অবৈধ হাটের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, কোরবানির পশুর বাজারে এখন ক্রেতাদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকে শেষ মুহূর্তে হাটে গিয়ে কম দামে পশু কেনার অপেক্ষায় থাকেন। ফলে ঈদের কয়েক দিন আগে পর্যন্ত হাটে বেচাকেনা ধীরগতিতে চলা স্বাভাবিক। তবে ব্যবসায়ীরা আশাবাদী, ঈদের শেষ দুই-তিন দিনে ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে এবং তারা প্রত্যাশিত দামে পশু বিক্রি করতে পারবেন। না হলে লোকসান গুনতে হবে অনেক ক্ষুদ্র খামারি ও ব্যবসায়ীকে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর জানান, চলতি বছর চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন যা হয়েছে, তাতে ৩৫ হাজার ৫২০টি গরু, মহিষ ও ছাগল ভেড়ার ঘাটতি আছে। যে পশু মজুদ আছে সেটা চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জন্য যথেষ্ট। যেটুকু ঘাটতি আছে সেটা পূরণে তিন পার্বত্য জেলা ও কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরের জেলাগুলো থেকে পশু আসবে। ফলে শেষ পর্যন্ত পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত