ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) কোম্পানির বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম-দুর্নীতি, সরকারি সম্পত্তি দখল ও ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য গত ১ জানুয়ারি এক সদস্যের অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে কমিশন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের নিবন্ধক ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি দিয়েছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মো. সাজিদ-উর-রহমান। চিঠিতে রেকর্ডপত্রের ফটোকপি আগামী ১৫ জুনের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে।
দুদক থেকে গত ২১ মে যৌথমূলধন কোম্পানিতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেডের (সাবেক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লি., বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ) বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেডের (সাবেক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড) নামে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর থেকে যে কোম্পানি বা ফার্ম নিবন্ধন করা হয়েছে তার যাবতীয় তথ্যাদি সংগ্রহপূর্বক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লি. ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধন সম্পর্কিত রেকর্ডপত্রসহ অনুমোদিত মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন এবং আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশনসহ কোম্পানি ও কোম্পানির মালিকানা, নিবন্ধিত অফিস, ফ্যাক্টরির তালিকা, সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন নং ও তারিখ, অথরাইজড ক্যাপিটাল, পেইড-আপ ক্যাপিটাল, শেয়ার সংখ্যা, পরিচালকবৃন্দ, পরিচালকদের সম্মতিপত্র, ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব রেকর্ডপত্রের ফটোকপি পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।’ এ ছাড়া ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেডের বাংলাদেশ অংশের বাংলাদেশ টোব্যাকো লিমিটেডের ঢাকা ও চট্টগ্রাম ফ্যাক্টরির মালিকানা কিভাবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ পেল এ সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্রের ছায়ালিপি চাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি বছরের শুরুতে এ অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এই কোম্পানির মালিক হওয়ার কথা বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু কীভাবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো এই কোম্পানির মালিক হলো তা জানা দরকার। কোম্পানিটির মালিকানা বাংলাদেশের থাকলে স্বাভাবিকভাবে লভ্যাংশও বাংলাদেশেই থাকত। লভ্যাংশ হিসেবে যে পরিমাণ টাকা বিদেশে নেওয়া হয়েছে তা করা যেত না।
তিনি আরও জানান, কোনো জাল-জালিয়াতি ও দুর্নীতি মাধ্যমে কোম্পানিটি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মালিকানায় নেওয়া হয়ে থাকলে লভ্যাংশ হিসেবে এ পর্যন্ত যে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা দুদক আইনে পাচার হিসেবে গণ্য হবে।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড (পিটিসি) একটি ব্রিটিশ মালিকানাধীন সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৪৭ সালে করাচিতে তাদের প্রথম কারখানা স্থাপন করে। কোম্পানিটি ১৯৫৬ সালে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দুটি কারখানা স্থাপন করে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার ও চট্টগ্রামের কারখানা এবং তাদের কার্যক্রমকে পিটিসি পরিত্যক্ত হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ১৯৭২, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া রিপোর্টে পিটিসি উল্লেখ করে, তারা বাংলাদেশের কাছে তাদের দুটি কারখানা হারিয়েছে এবং এ কারণে পাকিস্তানের ফেডারেল সরকার ও কর কর্র্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার তাদের কর-সুবিধ (ট্যাক্স রিলিফ) প্রদান করে এবং পিটিসি ক্ষতিপূরণ আদায় করে। তারা দাবি করে, পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত কারখানাগুলো হারিয়ে গেছে এবং সেগুলো আর তাদের ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এবং আইন অনুযায়ী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পিটিসির মালিকানাধীন ওই দুটি কারখানা, যা বর্তমানে বাংলাদেশের ভূখ-ে অবস্থিত, পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং আইনগতভাবে ১০০ শতাংশ বাংলাদেশের সরকারের মালিকানায় পরিণত হয়।
অভিযোগে বলা হয়, সাবেক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির তৎকালীন ফাইন্যান্স ম্যানেজার (পরবর্তীতে উপ-প্রধানমন্ত্রী) জামালউদ্দিন আহমেদ কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশ করে জাল নথিপত্র তৈরি করেন। পরে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট-স্টক কোম্পানির কাছে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানিকে নিবন্ধিত করান, যেখানে প্রতিষ্ঠানটিকে পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশের কোম্পানি হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর মালিকানাধীন হিসেবেই পরিচালিত হতে থাকে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, জয়েন্ট-স্টক কোম্পানির তৎকালীন রেজিস্ট্রার (নাম মোহাম্মদ আলী) ছিলেন একজন সৎ ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তিনি তখন গুলিস্তানে অবস্থিত জয়েন্ট-স্টক অফিসে কর্মরত অবস্থায় এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন। এতে তার চাকরি হারানোর উপক্রম হয়। মন্ত্রী ও কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তার চাপে শেষ পর্যন্ত তিনি ওই জাল নথিপত্র গ্রহণ করতে বাধ্য হন। দুটি কারখানাকে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির সম্পত্তি হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত করা হয়। যার সর্বাধিক শেয়ার বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানির মালিকানাধীন ছিল।
অভিযোগে আর বলা হয়, গত ৫৫ বছরে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। যদিও কারখানাগুলো আইনগতভাবে ১০০ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের মালিকানাধীন বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের অবৈধ কার্যক্রম, কর ফাঁকি ও ভ্যাট ফাঁকির বিষয়গুলো গোপন রাখতে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি গত তিন দশক ধরে সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তা ও সচিবদের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ দিয়ে এসেছে এবং লাভজনক এজেন্সি ব্যবসার মাধ্যমে রাজনীতিবিদদেরও সুবিধা দিয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ঢাকায় রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট-স্টক কোম্পানিজের কাছে সংরক্ষিত সব নথিপত্র এবং ইসলামাবাদ ও করাচিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের মাধ্যমে করাচির নথিপত্র যাচাই করা হলে, বিশেষ করে ১৯৭২-৭৫ সময়কালের পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো পরীক্ষা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবেও চিহ্নিত হতে পারে বলে দাবি করা হয়।
