মোহাম্মদ জহিরউদ্দিন পেশায় একজন নৈশপ্রহরী। বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার দুর্গম এলাকা ঈদগড় গ্রামে। এনজিও থেকে সহায়তা দেওয়ার কথা বলে তার ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন মোহাম্মদ আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তি। এরপর সেই পরিচয়পত্র দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে জহির ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চকবাজার শাখা থেকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। শুধু জহিরউদ্দিন নন, তার মতো রিকশাচালক, সেলুনের কর্মচারী (নরসুন্দর), দিনমজুর, অটোচালকসহ ৭৬ জনের এনআইডি নিয়ে ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এই ভয়ংকর জালিয়াতি করেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার ভাই ইউসিবি ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ বোর্ডের চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান চৌধুরী, সদস্য সচিব বশির আহমেদ ও ব্যাংক কর্মকর্তা ইমাম আদনানের নেতৃত্বাধীন চক্র। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে এ তথ্য উঠে এসেছে।
দুদকের তথ্য মতে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে ১০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ জমা হয় দুদকে। কমিশন অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নামে। অনুসন্ধানে সাইফুজ্জামান ও তার ভাই আনিসুজ্জামান সিন্ডিকেট ২১০টি প্রতিষ্ঠানের নামে ইউসিবি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাজার-হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্যপ্রমাণ মেলে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের বাইরের ৭৬ ব্যক্তির নামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য পায় দুদক। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে দুদক কর্মকর্তারা প্রকৃত ঘটনা জানতে ঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের স্থায়ী ঠিকানায় যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন ওই ৭৬ ব্যক্তির সবাই দিনমজুর, নৈশপ্রহরী, কৃষক, নরসুন্দর, রিকশাচালক, অটোচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা ঋণের বিষয়টি জানেনই না; ঋণের জন্য কোনোদিন ব্যাংকে যাননি; কখনো আবেদনও করেননি।
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানান, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার ভাই আনিসুজ্জামান সিন্ডিকেটই ২১০টি প্রতিষ্ঠানের নামে ইউসিবি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। রেকর্ডপত্র যাচাই করে চট্টগ্রামের বাসিন্দা নন এমন ৭৬ জনের নামে ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যারা মধ্যে কক্সবাজারের রামু উপজেলার দুর্গম এলাকা ঈদগড় ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির মানুষও রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের নামে ৭ থেকে ৯ কোটি টাকা করে ঋণ নেওয়া হয়েছে। দুদক বর্তমানে ৩৭ জনের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। অনুসন্ধান শেষে ইতিমধ্যে ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। পরে আরও ২০ জনের বিষয়ে অনুসন্ধান কাজ শুরু করবে।
যেভাবে কৃষক, মজুরের নামে ভুয়া ঋণ উত্তোলন করা হয় প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ইউসিবি ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বশির আহমেদ ব্যাংকের পরিচালক ও এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সদস্য সচিব ছিলেন। ওই সময়ে ১০ কোটি টাকার কম ঋণ হলে তা বোর্ডে পাঠানোর প্রয়োজন হতো না, এক্সিকিউটিভ বোর্ডই ঋণ মঞ্জুর করতে পারতেন। এই সুযোগটি কাজে লাগাতে মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী বশির আহমেদের প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দত্ত ও নুরুল আনোয়ারকে বিভিন্ন পেশার মানুষের এনআইডি ও ছবি সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। তারা বিভিন্ন লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে নিরীহ মানুষের এনআইডি গ্রহণ শুরু করেন। এনআইডি নেওয়ার সময় তাদের প্রত্যেককে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। এরপর সেই এনআইডি ব্যবহার করে ঋণের প্রস্তাব তৈরি করে ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ বোর্ডে পাঠাতে বিভিন্ন শাখা ম্যানেজারকে চাপ দেওয়া হয়। নির্দেশনা মতো তারা ঋণ প্রস্তাব এক্সিকিউটিভ বোর্ডে পাঠান। প্রস্তাব পাওয়ার পরই ঋণ অনুমোদন দেওয়া হতো। আর ঋণের টাকা উত্তোলন করে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী দুবাইয়ে পাচার করতেন।
যারা আর্থিক সহায়তা বা চাকরি পাওয়ার আশায় এনআইডি ও ছবি দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ৩৭ জনের পেশা ছিল রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, কৃষক, দিনমজুর ও সেলুনের কর্মচারী। এসব পেশায় ব্যাংক ঋণ হয় না জেনে তাদের এনআইডির পেশা পরিবর্তনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করা হয়। আবেদনে প্রত্যেকের পেশা নির্বাচন করা হয় ব্যবসায়ী হিসেবে। আর সেই আবেদনের কপি ও এনআইডি দিয়ে প্রত্যেকের নামে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে। এরপর সেই ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই ৭ থেকে ৯ কোটি টাকা করে ঋণ অনুমোদন করা হয়। যা পরে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়।
প্রতারণার শিকার হওয়া আবুল কালামের ভাষ্য মোহাম্মদ আবুল কালামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়ায়। তিনি পটিয়ায় আইডিসি (প্রোডাক্ট)-এর সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। সেলসম্যান হিসেবে চাকরি করার সময় একই এলাকার বাহুলী গ্রামের মুহাম্মদ নুরুল আনোয়ারের বাসায় ভাড়া থাকতেন। ২০২০ সালের প্রথম দিকে একদিন নুরুল আনোয়ার জানান, তার মালিক কিছু গবির মানুষকে সহায়তা করবেন। তিনি যেন সহায়তা প্রত্যাশী ১০০ জনের এনআইডি ও ছবি সংগ্রহ করে দেন। নুরুল আনোয়ারের কথায় বিশ্বাস করে তিনি নিজের এনআইডিসহ বিভিন্ন এলাকার ৫৩ জনের এনআইডি ও ছবি সংগ্রহ করে দেন। এ কাজের জন্য তাকে ১৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে আরও ৪০ হাজার টাকা পান তিনি। ২০২২ সালে তিনি ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কক্সবাজার শাখায় অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে জানতে পারেন তার নামে একই ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখায় অ্যাকাউন্ট খোলা আছে এবং সেখানে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তার নামে ফেয়ার ফুড ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে সেই প্রতিষ্ঠানের নামে ইউসিবি ব্যাংকের পাহাড়তলী শাখা থেকে ৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। তিনি এই ঋণের জন্য আবেদন করেননি, তিনি কোনোদিন ব্যাংকের ওই শাখায়ও যাননি।
জানা গেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের আগস্ট অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ দুদকে জমা হতে থাকে। ওই তালিকায় রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ও সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে পাচার করেন। দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন।
