ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন তার বোন মাসুমা হাদি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন কার অনুমতি নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এ হত্যা মামলার বাদী হলো, তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে। গতকাল শুক্রবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে মাসুমা হাদি এসব কথা লিখেছেন।
কার নির্দেশে হাদির হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি জনসভায় একটি ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। হাদির ভাইও এ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। এ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে মাসুমা হাদির পোস্টটি এলো।
তিনি লিখেছেন ‘আমি আমার ভাইয়ের মামলার বাদী নিয়ে কিছুই বলতে চাচ্ছিলাম না। কারণ এর চেয়েও অনেক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র চালিয়েছে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে। সেই বিষয়েও এখন অব্দি আমি মুখ খুলিনি, শুধু আমার ভাইয়ের জন্য। আমি মুখ খুললে সবার একটাই প্রশ্ন সামনে আসবে যে, আমার ভাইয়ের আশপাশে যারা থাকে, তার পরিবারকে নিয়ে এই ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে কীভাবে লিপ্ত হতে পারে।’ তবে গত দুই দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে তার ভাইয়ের মামলার বাদী হওয়া নিয়ে যে পরিমাণ ‘নোংরামি’ হচ্ছে সেজন্য বাধ্য হয়ে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করছেন বলে জানান।
মাসুমা হাদি বলেন, ‘আমার ভাই যেদিন গুলিবিদ্ধ হলো, সেই সংবাদ শোনামাত্র আমি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিই এবং সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে চলে যাই। হাসপাতালে যাওয়ার পর থেকে এক মিনিটের জন্য আমি হাসপাতাল ছেড়ে বাসায় যাওয়া তো দূরের কথা ওসমান গণিকে (শরিফ ওসমান হাদি) ছেড়ে নিচতলায় পর্যন্ত যাইনি।’
তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘প্রশাসনের লোক এভারকেয়ারে এসে জাবেরের কাছ থেকে সাইন নিল কেন? আর আমি উপস্থিত থাকাকালীন জাবের সাইন দেবে কেন? এ নিয়ে আমি বহুবার প্রশ্ন করেছি। আমাকে বোঝানো হয় যে, ওমরের (ওসমান হাদির ভাই) কাছে নাকি গিয়েছিল, ওমর বলছে এখন আমরা চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত। চিকিৎসা সম্পন্ন হলে এ বিষয়গুলো দেখা যাবে।’
মাসুমা হাদি মনে করিয়ে দেন, ‘এ ধরনের অতি গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলায় বাদীর স্বাক্ষর আগে-পরে হওয়া নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা নেই। এমনকি বাদীপক্ষ থানায় মামলা না করলেও পুলিশ ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সকল প্রকার আইনি কার্যক্রম চালাতে পারে।’
ঘটনার দিনের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে মাসুমা হাদি লেখেন, ‘ওই মুহূর্তে ওমরের মানসিক অবস্থা যে কী, সেটা সবারই অনুভব করার কথা। ওসমান গণির (হাদি) রক্তে ওমর ফারুক রক্তাক্ত ছিল। কারণ একই রিকশায় দুই ভাই। বুলেট যদি আর একটা বের হতো ওমর হাদিও ওখানেই আমার ওসমান গণির মতো হয়ে যেত।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন ‘মামলার বাদীর ব্যাপারে কার কাছে বলছে, কে বলছে যে, আমরা নিরাপত্তার জন্য বাদী হতে চাই না। জাবের যদি আমার নলছিটির ছেলে না হতো, তা কোনো প্রশ্ন ছিল না। কারণ আমার ওসমান গণির সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন চলাফেরা করছে, এমন কোনো লোক নেই যারা জানে না ওসমান গণির জীবনে তার ছোট আপু কতটা জড়িয়ে। এবং তার ছোট আপু ওসমান গণির জন্য জীবন দিতে এক সেকেন্ড চিন্তা করে না। সেই ছোট আপুর কাছে না এসে কার অনুমতি নিয়ে জাবের মামলার বাদী হলো এটি পরিষ্কার করতে হবে।’
হাদি যে ঘড়িটা পরতেন পাঁচ বছর আগে কেনা দাম ছিল ১৭ হাজার টাকা, যে ব্লেজার পরতেন তার মূল্য ৩০ হাজার টাকা এবং মোবাইলটার মূল্য ছিল ৭০ হাজার টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুধু এই তিনটা জিনিসের হিসাব দিতে বাধ্য হলাম এজন্য যে না বুঝে কেউ নোংরামি করার চেষ্টা করবেন না।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন বিপ্লবীকে সম্মান করতে গিয়ে তার পরিবারকে নিয়ে কীভাবে এত মিথ্যাচার করা যায়। একই সঙ্গে তিনি আহ্বান জানান, কোনো বিষয়ে মন্তব্য করার আগে যেন সবাই সত্যতা যাচাই করেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। পরে তার মরদেহ দেশে আনা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে দাফন করা হয়। হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন পালিয়ে গিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।
