তুরস্ক প্রতিরক্ষাশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত পরিসরে বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বকে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীরতর করতে চায়। ঢাকা সফররত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বৈঠকের পর দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অংশগ্রহণে যৌথ সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিনের সফরে তুরস্কের মন্ত্রী গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা পৌঁছান। গতকাল তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
কোনো নির্ধারিত আলোচ্যসূচি ছাড়াই দুই মন্ত্রী নিজ নিজ প্রতিনিধিদলসহ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করেন। এরপর দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একান্তে প্রায় ৩০ মিনিট কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগগুলো খুঁজে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষাশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য দুই দেশ পদক্ষেপ নিতে পারে।
হাকান ফিদান বলেন, তুরস্ক বিস্তৃত পরিসরে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে গভীরতর করার এবং এটিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি জোরদার করতে দুই দেশের যৌথ অঙ্গীকারকে সুদৃঢ় করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখা হবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তুরস্কের মন্ত্রী বলেন, আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধ-পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া বৈশি^ক অর্থনীতি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক। যুদ্ধ অবসানের জন্য পাকিস্তানের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যৌথ অঙ্গীকার প্রদর্শন করতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশে তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠা করা গেলে পোশাক, বস্ত্র, জাহাজনির্মাণ, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নগযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বড় তুর্কি বিনিয়োগ আসবে। তিনি জানান, তারা দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেছেন।
অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতেও তুরস্কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায়। এই লক্ষ্যে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন অথবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য তুরস্ককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা বৃত্তির সংখ্যা বাড়াতে তুরস্ককে অনুরোধ করা হয়েছে।
বর্তমানে তুরস্কে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করে; যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর দুই দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করা হয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও তুরস্কের মন্ত্রী হাকান ফিদান স্মারকে সই করেন।
স্মারকের আওতায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রত্নসম্পদ রক্ষা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, মহাফেজখানার নথি ও গ্রন্থাগারসামগ্রী সংরক্ষণ, ডিজিটাইজেশন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত হলো।
এ স্মারকের আওতায় দুই দেশ ইউনেসকোর ১৯৭০ সালের কনভেনশনের আলোকে সাংস্কৃতিক সম্পদের অবৈধ আমদানি-রপ্তানি ও মালিকানা প্রতিরোধে যৌথভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি প্রত্মতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস, সাংস্কৃতিক সম্পদের তালিকাভুক্তি ও নথিবদ্ধকরণে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। স্মারকটি দুই দেশের সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
