নিজাম হাজারীর ভাগিনা পরিচয় দেওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী আজিজুল হককে নারায়ণগঞ্জের তারাব পৌরসভা থেকে ফের ফেনী পৌরসভায় বদলি করা হয়েছে। আর ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির উদ্দিনকে বদলি করা হয় তারাব পৌরসভায়। গত বুধবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশ থেকে এ তথ্য জানা যায়। এদিকে আজিজুল হককে আবার ফেনীতে বদলির খবরে জনমনে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে বলেও জানায় পৌরসভার নির্ভরযোগ্য সূত্র।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তিন মেয়াদের বেশিরভাগ সময়েই ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন আজিজুল হক। সে সময়ে মেয়র পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন পদে রদবদল হলেও বহাল তবিয়তে ছিলেন দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড খ্যাত আজিজ। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর কিছুটা বিপাকে পড়েন তিনি। অন্যত্র বদলি করা হলেও পুরনো কায়দায় তা ঠেকিয়ে দেন। একপর্যায়ে তাকে তারাব পৌরসভায় স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। সেখান থেকে বারবার চেষ্টা করেন ফেনীতে ফিরতে। অবশেষে গত বুধবার ফেনী পৌরসভায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়।
জানা যায়, ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী পদে আজিজুল হক প্রায় দেড় যুগ ধরে বহাল তবিয়েতে আছেন। তিনি ফেনী পৌরসভায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন ২০০৭ সালে। ছয় বছর পর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়ে থেকে যান একই পৌরসভায়। টানা দেড় যুগ একই স্থানে থেকে পৌরসভাকে নেন হাতের মুঠোয়। বারবার তার বদলির আদেশ হলেও ফেনী ছাড়েননি। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ আছে।
আজিজুল হক ফেনীর সাবেক এমপি নিজাম হাজারীকে মামা পরিচয় দিয়ে মেয়রকেও শাসাতেন। এতে তার অপকর্মের বিষয়ে কেউ কথা বলতে পারত না। ইতিমধ্যে তাকে কয়েকবার বিভিন্ন পৌরসভার বদলি করা হলেও অদৃশ্য খুঁটির জোরে আবার ফেনীতে ফিরে আসেন।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, আজিজুল হক ফেনীতে থাকাকালীন বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত কর্মকা- ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত ছিলেন। তখনকার সময়ের মেয়র যথাক্রমে নিজাম হাজারী, হাজী আলাউদ্দিন ও নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজীর আস্থাভাজন ছিলেন। মেয়রদের দুর্নীতিতে সহায়তা দিতেন আজিজ। এ কারণে তিনি এখানে ‘দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাতি পান। আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে গড়ে তুলেন সম্পদের পাহাড়। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দুইটি ফ্ল্যাট, ফেনী শহরের মিজানপাড়ার শর্শদী হাউজে দুইটি ফ্ল্যাট, ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের পশ্চিম পাশে গোলাপবাগ রাস্তার উত্তর মাথায় বিশাল বাগানবাড়ি ছাড়াও অনেক সম্পদ রয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ফেনীতে ফিরতে বিএনপির নেতাদের ম্যানেজে মরিয়া হয়ে ওঠেন আজিজুল হক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌরসভা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এর মধ্যে দুইটি প্রতিষ্ঠানের নাম জানা গেছে। একটি হলো ‘ফ্যাক্ট ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’। অপরটি হলো ‘সয়েল টেক ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট’। দুটির ঠিকানাই ফেনী শহরের মাস্টারপাড়া ‘মদিনা ভবনে’।
সূত্র জানায়, আজিজুল ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণে যেকোনো কাজের অনুমোদনের জন্য তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করতেন। এ জন্য নেওয়া হতো উচ্চমূল্য। মূলত নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়ন তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হয়। এতে করে সহজে পৌরসভার অনুমোদন মিলত। নকশা তৈরি ও বাজেট প্রণয়ন একজন স্বীকৃত প্রকৌশলীর মাধ্যমে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি নিজে কাজ করে অন্য এক প্রকৌশলীর জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করতেন বলে জানা গেছে। দুদক ফেনী-নোয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রকৌশলী আজিজের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
প্রকৌশলী আজিজুল হক জানান, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি পলাতক নিজাম হাজারী তার আপন মামা নন। তার এক আত্মীয়ের বন্ধু হওয়ায় তাকে মামা পরিচয় দিতেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক নয় ।
