শাহজালাল বিমানবন্দরে কার্গোর আগুন ‘রহস্যজনক’

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:১৬ এএম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় আগুনের ঘটনা ‘সন্দেহজনক’ মনে করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এরই মধ্যে নানা ধরনের ‘অসঙ্গতিও’  সামনে এসেছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের একাধিক সংস্থাও কাজ করছে মূল ঘটনা বের করতে। ইতিমধ্যে কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শুক্রবার রাতেই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই সময় কয়েকশ কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি তুলেছিলেন ব্যবসায়ীরা। এ ঘটনার ক্ষত না শুকাতেই আবারও আগুনের ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএইচএল কুরিয়ারের শেড থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয় এর আগে। শুক্রবার রাতেও একই শেড থেকে আবার আগুনের ঘটনা ঘটে। এতেই বেশি সন্দেহ হচ্ছে। শেডে থাকা পণ্যগুলো আজ রবিবার নিলামে ওঠার কথা ছিল। হ্যাঙ্গার সংশ্লিষ্ট ডিএইচএলের শেডের যে স্থানে আগুন লাগে, সেটি সিসি ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল। ঘটনাস্থলের সামনের অংশে ছিল একটি বৈদ্যুতিক পিলার। তার নিচে কিছু তারও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। শর্ট সার্কিট হলে অবশ্যই স্পার্ক হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনার সময় তা হয়নি। এমনকি শর্ট সার্কিট হলে বিদ্যুতের লাইটও বন্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু এগুলো কিছুই হয়নি। আমরা ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, যে স্থানটিতে আগুন লেগেছে তার কিছু দূরে সিগারেটের শেষের কয়েকটি অংশ পড়েছিল। ওই এলাকায় ধূমপান নিষিদ্ধ। কিন্তু সিগারেট থেকে আগুন লাগলে তা থেকে ধোঁয়া বের হবে। পরে ধীরে ধীরে আগুন জ্বলবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সে রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে।

ঘটনাস্থলের আশপাশে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন, রাত তখন সাড়ে ১১টার কাছাকাছি। ঘটনাস্থলে আশপাশে ডিএইচএলের একজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। যাকে সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা গেছে। ওই কর্মী মশারি টাঙিয়ে সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে আগুন লাগার দেড় থেকে দুই মিনিট তিনি খুবই শান্তভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখছিলেন। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তিনি বিষয়টি সবাইকে জানানোর জন্য ফোন করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএইচএলের ওই কনটেইনারে বিভিন্ন মালামাল ছিল। তার মধ্যে কাপড়ের রোল, পেপার আইটেম, রাবার আইটেম, প্লাস্টিক আইটেমসহ নানারকম পণ্য ছিল। এ পণ্যগুলো রবিবার নিলাম হওয়ার কথা ছিল।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বলেন, ‘ঘটনাটি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পরেই অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বলা যাবে।’

শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, তদন্ত হচ্ছে। কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত, তা আমরা দেখছি। পাশাপাশি কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়েছে কি না তাও উদঘাটন করা হবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরই আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। এ বিষয়ে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিরূপণ করা হবে। ‘প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।’ তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বারবার শর্ট সার্কিটের ঘটনা কেন ঘটছে। এর আগেও যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল, সেই তদন্ত প্রতিবেদনেও শর্ট সার্কিটের কথা বলা হয়েছিল। তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও গাফিলতি রয়েছে। আমাদের সেটি স্বীকার করতে হবে।’ যদি কারও গাফিলতির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এর আগের অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই ঘটনার পরও নতুন শেড নির্মাণ করা হয়নি। কারণ থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় নতুন কার্গো সুবিধা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানের সঙ্গে চুক্তির আওতায় থার্ড টার্মিনালের পেছনে আমদানি ও রপ্তানির জন্য দুটি আধুনিক কার্গো গোডাউন নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব গোডাউনে প্রায় আট লাখ টন করে পণ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত