১৯৬৬ সালের ৭ জুন, মঙ্গলবার। ভোর থেকেই ছয় দফা দাবিতে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। পুলিশের দুর্ভেদ্য ব্যুহ ভেদ করে এগিয়ে চলে তাদের অবিচ্ছিন্ন মিছিল। মিছিলের তরঙ্গমালায় সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী উপনিবেশবাদী পাকিস্তানের শাসক ও শোষক শ্রেণির ভিত কেঁপে ওঠে। তাই সংগ্রামী জনতার বিপক্ষে কাপুরুষের মতো ওরা লেলিয়ে দেয় সরকারি বাহিনী। শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল এই গণবিক্ষোভকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে। কিন্তু তার ফলাফল হয় উল্টো। বন্দুক-কামান উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচিকে বুকে ধরে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টি করে সংগ্রামী জনতা। রাজধানী থেকে জেলা-মহকুমাসে এক অভূতপূর্ব জাগরণ। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জনতার এমন উন্মাদনা আগে কখনো দেখা যায়নি।
ওই দিন খবর ও ছবি প্রকাশের ব্যাপারে সরকার সংবাদপত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ঢাকা থেকে তখন প্রকাশিত হতো দৈনিক পাকিস্তান, আজাদ, সংবাদ, ইত্তেফাক, পয়গাম, পাকিস্তান অবজারভার ও মর্নিং নিউজ। প্রেস অর্ডিনেন্সের ক্ষমতাবলে শাসকগোষ্ঠী গভীর রাতে পত্রিকা অফিসগুলোতে প্রেসনোট পাঠায়। আসল ঘটনা আড়াল করে প্রেসনোটে বলা হয়, ‘পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য উচ্ছৃঙ্খল জনতার উপর গুলি চালায়।’ পরের দিন ওই বানোয়াট প্রেসনোট দিয়েই পত্রিকাগুলো প্রকাশিত হয়। তখনকার পাঁচটি প্রধান দৈনিকে প্রেসনোট ছাপতে বাধ্য হলেও বেঁকে বসে সংবাদ। এর প্রতিবাদে সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী আর কার্যনির্বাহী সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সার সংবাদ-প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেন। সংবাদ-এর এই সিদ্ধান্ত ছিল সাহসী, ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী। পরের দিন ৯ জুন সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই দিনও শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পত্রিকাটি নীরব প্রতিবাদ জানায়। প্রথম পৃষ্ঠায় দুই কলামে কালো বর্ডারের ভেতর কর্মাধ্যক্ষের বরাত দিয়ে সংবাদ লিখে‘আমাদের নীরব প্রতিবাদ। যে মর্মান্তিক বেদনাকে ভাষা দেওয়া যায় না, সেখানে নীরবতাই একমাত্র ভাষা। তাই গতকল্য সংবাদ প্রকাশিত হইতে পারে নাই। আমাদের নীরব প্রতিবাদ একক হইলেও ইহাতে আমাদের পাঠকরাও শরীক হইলেন, ইহা আমরা ধরিয়া লইতেছি।’
ওই দিন ছিল পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল। হরতালের ডাক দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সকাল থেকেই ঢাকা শহর অচল হয়ে যায়। কলকারখানার কাজকর্ম বন্ধ করে হরতালে যোগ দেয় মেহনতি শ্রমিকরা। ছাত্র-শ্রমিক-জনতা মিলে নাখালপাড়ার রেললাইন উপড়ে ফেলে। বিচ্ছিন্ন করে দেয় টেলিফোন-টেলিগ্রাফের লাইন। আক্রমণ চালায় তেজগাঁওয়ে ডাইরেক্টর অব ল্যান্ড রেকর্ডস অ্যান্ড সার্ভে অফিস ও সেটেলমেন্ট প্রেসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। ছাত্ররা কার্জন হলে পুলিশের গাড়িতে ও হাইকোর্টের সামনের তিনটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্টেট ব্যাংকে [বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক] আক্রমণ করলে পুলিশ গুলি চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। স্টেট ব্যাংক আক্রমণ করার দুঃসাহস যে ক্ষমতা-দখলের চূড়ান্ত আন্দোলনেরই পূর্বাভাস তা ওই দিন অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোঝা গিয়েছিল পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের আলাদা হতে আর বেশি সময় নেই।
৭ জুন ঢাকার তেজগাঁওয়ে, টঙ্গীতে, নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকের উপর পুলিশের গুলি চলে। বুলেটের সামনে বুক মেলে ধরেন বীর শ্রমিক মনু মিয়া, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুলসহ নাম না জানা ১২ শ্রমিক আর ছাত্রকর্মী। শ্যামল বাংলার দামাল ছেলেদের বুকের রক্তে সংগ্রামের যে সিঁড়িপথ নির্মিত হয়, সেই পথ দিয়েই আসে উনসত্তরের গণআন্দোলন। ৬ দফা দুর্বার গণআন্দোলনের প্রচন্ড ঝাঁকুনি লাগে শাসকের দুর্গে। আর তাতেই স্বৈরাচারী আইয়ুব-মোনায়েমের পতন ঘটে। আর এই পথেই আসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের রক্তাক্ত পথে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। তাই ছয় দফাকে বলা হয় বাঙালির মুক্তির সনদ।
ছেষট্টির ৭ জুনের ঘটনা কেন ছাপা যায়নি সে বিষয়ে ব্যাখা দিয়ে ১৯৭০ সালের ৭ জুন একটি উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশ করে সংবাদ। ‘সংবাদ সেদিন আত্মপ্রকাশ করে নাই কেন’ শিরোনামের উপসম্পাদকীয়তে বলা হয়‘সেদিনের সব সংবাদের ইতিবৃত্ত কোনো পত্রিকার পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হইতে পারে নাই। সেদিনের সব শহীদের নাম জানা যায় নাই, যাহাদের নাম জানা গিয়াছিল তাহাদেরও সবার নাম প্রকাশিত হয় নাই। সেদিন কোনো পত্রিকায়ই ঘটনার পুরোপুরি রিপোর্ট দিতে পারে নাই। কেননা, আইয়ুবের খলিফা মোনায়েমের ডান্ডা শুধু রাস্তাঘাটে, কলকারখানায় ব্যবহৃত হয় নাইব্যবহৃত হইয়াছিল সংবাদপত্রগুলোর বিরুদ্ধে। কালাকানুন শুধু জারি ছিল না, সেই কানুন দোর্দ- প্রতাপে ব্যবহার করিতে ছিলেন আইয়ুব এবং তাহার সুযোগ্য সাগরিদ মোনায়েম খান। প্রেস অর্ডিনেন্সের বদৌলতে সব পত্রিকার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং সত্য ঘটনার রিপোর্ট দান বন্ধ করা হয়। প্রায় সব পত্রিকায়ই নিজ নিজ রিপোর্ট প্রস্তুত করিয়াছিল, কিন্তু সেই রিপোর্ট কেহ প্রকাশ করিতে পারে নাই। গভীর রাত্রিতে সরকারি প্রেসনোট জারি করা হয় এবং পত্রিকাগুলোকে বলা হয়, প্রেসনোট ছাড়া অন্য কিছু কেহ প্রকাশ করিতে পারিবে না। সত্য ঘটনা প্রকাশ করা যাইবে না। এই অবস্থার প্রতিবাদে সেদিন গোটা পত্রিকা ছাপার সত্ত্বেও সংবাদ আত্মপ্রকাশ করে নাই।’
সেদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছবি তুলেছিলেন সংবাদ-এর নিজস্ব আলোকচিত্রী রশীদ তালুকদার। তার তোলা ছয় দফার ছবিগুলো ছাপা হয় স্বাধীনতার পরের বছর, ১৯৭২ সালের ৭ জুন। ঐতিহাসিক ছয় দফা উপলক্ষে রশীদ তালুকদারের সাতটি ছবি প্রকাশ করে পত্রিকাটি। ছয়টি ছাপা হয় শেষ পৃষ্ঠায়, আরেকটি সপ্তম পৃষ্ঠায়। সপ্তম পৃষ্ঠায় যে ছবিটি ছাপা হয় তাতে দেখা যায়, হাইকোর্টের সামনে দাউ দাউ করে জ¦লছে একটি বাস [ই বিএ : ৬৩৪৩]। ধোঁয়ার কু-লিতে আকাশ কালো হয়ে গেছে। আগুন নেভানোর মতো একজন মানুষও কাছেপীঠে নাই। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা ‘একটি অপ্রকাশিত আলোকচিত্র : ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ৭ই জুন হাইকোর্টের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতা বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেদিন আন্দোলনের খবর অথবা আলোকচিত্র স্বৈরাচারী সরকার ছাপতে দেয়নি।’
সংবাদ-এর শেষ পৃষ্ঠায় যে ছয়টি সিরিজ ছবি ছাপা হয়, তার মূল শিরোনাম‘জনতার বিদ্রোহ দাউ দাউ বহ্নি’। রিভার্সের ভেতর এই শিরোনাম যেন এক গভীর শোক আর ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। শিরোনামের পাশে লেখা‘১৯৬৬-র রক্তাক্ত ৭ই জুনের অপ্রকাশিত কিছু আলোকচিত্র’। পাতার মাঝ বরাবর একটি সামগ্রিক ক্যাপশন। তাতে লেখা‘গত ১৯৬৬ সালে রক্তাক্ত ৭ই জুনের আন্দোলন ও আইয়ুব শাহীর স্বৈরাচারের সাক্ষ্য এই আলোকচিত্রগুলো সেদিন খুনি সরকার ছাপতে দেয়নি। আজকে স্বাধীন বাংলাদেশে সেদিনের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল প্রতিরোধ সংগ্রামের অপ্রকাশিত আলোকচিত্রগুলোর কয়েকটি এখানে দেওয়া হলো। ফটো তুলেছেন সংবাদ এর নিজস্ব আলোকচিত্রশিল্পী জনাব আবদুর রশীদ তালুকদার।’
ক্যাপশনের পাশে লেখা প্রতিবাদী কয়েকটি লাইন‘তুমি ভাবো তুমি শুধু নিতে পারো প্রাণ/তোমার সহায় আছে নিষ্ঠুর কামান,/ আমাদেরও উষ্ণ বুক রক্ত গাঢ় লাল/ ইতিহাস আমাদের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছে মহাকাল।’
