‘কে যাসরে ভাটি গাঙ বাইয়া, আমার ভাইধন রে কইয়ো নাইওর নিতে বইয়া’ গানটি বাংলা লোকগানের এক অবিস্মরণীয় রতœ। গানটির মূল গীতিকার মীরা দেব বর্মণ আর সুরকার ও মূল শিল্পী শচীন দেব বর্মণ। এটি এমন এক আবেগঘন বিরহের গান, যেখানে এক বোন তার ভাইয়ের কাছে খবর পৌঁছে দিতে সুজন মাঝিকে অনুরোধ করেন। বিয়ের পর মেয়ের বাবার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সেই চিরায়ত নাইওর ‘নাইয়র প্রথা’ এখন বিলুপ্তপ্রায়। ঐতিহ্যবাহী এই প্রথাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে পটুয়াখালীতে আয়োজন করা হলো ব্যতিক্রমধর্মী নাইওর উৎসব।
গতকাল শনিবার সকালে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘দখিনের কবিয়াল’ ও ‘শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে দিনব্যাপী এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৭৫টি পরিবারের প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষ অংশ নেন। বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের আবহে পালকির আদলে ‘নাইওর’ আসা বধূদের বরণ করে নেওয়া হয়। নাচ, গান, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। অতিথিদের পরিবেশন করা হয় নানা ধরনের পিঠাপুলি, মৌসুমি ফল ও গ্রামীণ স্বাদের বাহারি খাবার, যা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
একসময় গ্রামবাংলায় নাইওর ছিল পারিবারিক সম্পর্ক ও ভালোবাসার এক অনন্য বন্ধন। ভাদ্র কাটানি, জোড়া মাস, প্রথম সন্তান জন্মের পর, শীতে পিঠাপুলি খাওয়া কিংবা জ্যৈষ্ঠে আম-কাঁঠাল উপভোগ, বিভিন্ন উপলক্ষে মেয়েরা বাবার বাড়িতে নাইওর যেতেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রথা এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
উৎসবের আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, ‘নাইওর শুধু একটি প্রথা নয়, এটি বাঙালির পারিবারিক সংস্কৃতি, আবেগ ও আত্মীয়তার প্রতীক। আগের মতো এখন আর নববধূরা নাইওর যান না, বাবার বাড়ি থেকেও সেভাবে নিতে আসা হয় না। তাই হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই আমাদের এই আয়োজন।’
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নবদম্পতিরাও এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তাদের মতে, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও এমন আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির শেকড়কে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করেছে। স্নেহাংশু সরকার কুট্টির সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ।
