মালয়েশিয়ায় অনেকেই ভিসার শর্ত অমান্য করে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় বিদেশিদের ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাম্প্রতিক নির্দেশনাকে ঘিরে দেশটির ব্যবসায়ী মহল ও প্রবাসী কমিউনিটিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, স্থানীয় কিংবা বিদেশি-যে-ই হোক না কেন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স, ভিসা বা ব্যবসায়িক সুবিধার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বক্তব্যের সুত্রে জানা গেছে মালয়েশিয়ায় স্থানীয় ব্যবসার লাইসেন্স ব্যবহার করে বিদেশিদের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা, বিভিন্ন ধরনের ভিসার অপব্যবহার এবং কথিত ‘আলী বাবা’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের নামে লাইসেন্স নিয়ে বিদেশিদের ব্যবসা পরিচালনা, প্রক্সি কোম্পানি গঠন এবং ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ থাকলেও এবার সরকার বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল সাংবাদিকদের বলেন, আইন লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনা, লাইসেন্সের অপব্যবহার বা ভিসার শর্ত ভঙ্গের ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে স্থানীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার এ বক্তব্যকে অনেকেই সরকারের পক্ষ থেকে একটি ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা হিসেবে দেখছেন।
মালয়েশিয়ায় বহু বছর ধরে আলোচিত একটি বিষয় হলো ‘আলী বাবা’ ব্যবসা। স্থানীয়ভাবে এর অর্থ হলো-কোনো মালয়েশীয় নাগরিক তার ব্যবসায়িক লাইসেন্স বা কোম্পানির নিবন্ধন ব্যবহার করে বিদেশিদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দেন। কাগজে-কলমে ব্যবসার মালিক স্থানীয় ব্যক্তি হলেও বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনা করেন বিদেশিরা।
ব্যবসায়িক মহলের একাধিক সূত্র জানায়, খুচরা ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, মুদি দোকান, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি এবং অনলাইন বাণিজ্যের কিছু ক্ষেত্রে এমন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুয়ালালামপুরভিত্তিক এক ব্যবসায়ী বলেন, অনেক বিদেশি বৈধ পথে ব্যবসা শুরু করতে না পেরে স্থানীয়দের লাইসেন্স ব্যবহার করেন। আবার কিছু স্থানীয় ব্যক্তি মাসিক অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স ভাড়া দেন। এতে সরকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি ব্যবসা খাতে জবাবদিহিও কমে যায়।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী, সামাজিক ভিজিট, ডিপেনডেন্ট কিংবা অন্যান্য ভিসায় প্রবেশ করে অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা বা চাকরিতে যুক্ত হওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। অভিবাসন আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি ব্যবসা পরিচালনা বা কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন না।
কিন্তু বাস্তবে কিছু ব্যক্তি ভিসার শর্ত অমান্য করে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন অভিবাসন পরামর্শক জানান, অনেকেই মনে করেন ভিসা পেলেই সব ধরনের কাজ করা যাবে। বাস্তবে প্রতিটি ভিসার আলাদা শর্ত রয়েছে। সেই শর্ত ভঙ্গ করলে জরিমানা, আটক কিংবা বহিষ্কারের মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতারা মনে করছেন, সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থানকে গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। কারণ কোনো ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করলে তার দায় পুরো কমিউনিটির ওপর বর্তাতে পারে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির এক নেতা বলেন, মালয়েশিয়ায় অধিকাংশ বাংলাদেশি বৈধভাবে কাজ ও ব্যবসা করছেন। তবে অল্পসংখ্যক মানুষের অনিয়ম পুরো কমিউনিটির জন্য সমস্যা তৈরি করে। তাই সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তিনি আরও বলেন, ভিসার ধরন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং ব্যবসা করতে হলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়িক মহলের ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর অভিবাসন বিভাগ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কোম্পানি কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইসেন্স ভাড়া দেওয়া, প্রক্সি ব্যবসা এবং ভিসার অপব্যবহার বন্ধ করা গেলে মালয়েশিয়ার ব্যবসা খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, সরকারি রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং বৈধ বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে। তাদের মতে, সরকারের এই পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবসা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কঠোর বার্তা এখন কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতার ওপর। তবে ব্যবসায়ী ও প্রবাসী মহলের অনেকেই মনে করছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অবৈধ ব্যবসা ও ভিসা অপব্যবহারের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং বৈধ উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
