মিশরের কায়রোতে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি উপদলের নেতাদের সঙ্গে ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকরের লক্ষ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই আলোচনার মধ্যেই অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকাজুড়ে ভোর থেকে নতুন করে চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সংগ্রহ করা তথ্য থেকে এই খবর জানা গেছে।
সংবাদমাধ্যমটির মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকরা জানিয়েছেন, রবিবার (৭ জুন) গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের কাছের আল-মাওয়াসি এলাকা, গাজা সিটি এবং দেইর আল-বালাহতে এই হামলাগুলো চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এক ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির আওতায় গত বছরের (২০২৫ সালের) অক্টোবর থেকে বড় ধরনের লড়াই বন্ধ রয়েছে। তবে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রিকরণ এবং দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ভারী ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা পুনর্গঠনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট পরবর্তী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো সমঝোতা এখনও হয়নি।
রয়টার্সকে দেওয়া হামাস সূত্র ও কায়রো আলোচনার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের তথ্যমতে- হামাস প্রতিনিধিরা ‘বোর্ড অব পিস’ এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ মিশর, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো ধরনের অগ্রগতির জন্য গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া অপরিহার্য। কায়রোর এই আলোচনা আরও বেশ কয়েক দিন ধরে চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অব্যাহত ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৯৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২,৯০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে হামাস যোদ্ধাদের হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির এই সময়েও ফিলিস্তিনিদের আবাসিক ভবন, বাজার, যানবাহন এবং ক্যাফেগুলোতে অনবরত হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি বাড়িঘরে বোমা হামলার মাত্র কয়েক মিনিট আগে স্থানীয় পরিবারগুলোকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে গাজা উপত্যকার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত ৫৩ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করছে এবং অবশিষ্ট ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। গত ২৮ মে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, তিনি গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ৭০ শতাংশে উন্নীত করতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
চুক্তির প্রথম ধাপ অনুযায়ী, হামাস তাদের কাছে থাকা সমস্ত বন্দীদের মুক্তি দেয় এবং বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগারে আটক কিছু ফিলিস্তিনি মুক্তি পান। এরপর দুই পক্ষের আরও সংবেদনশীল দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করার কথা ছিল। এই ধাপে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীটির (হামাস) অস্ত্র সমর্পণ এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার শুরু হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু মূল বিরোধের জায়গাগুলোতে- বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রিকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় কয়েক মাস ধরে এই প্রক্রিয়াটি থমকে আছে।
গত শুক্রবার হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হুসাম বাডরান আল জাজিরাকে বলেন, দলটি এখনই তাদের অস্ত্র হস্তান্তর করবে না। তিনি স্পষ্ট জানান, হামাসের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের ভাগ্য কী হবে, তা অন্যান্য ফিলিস্তিনি উপদলগুলোর সঙ্গে ব্যাপক আলোচনার পর নির্ধারণ করা হবে।
গাজায় ইসরায়েলের চালানো এই নৃশংস ও গণহত্যামূলক যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ৭২,৯৭১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার প্রায় পুরো এলাকা এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১৯ লাখ মানুষ। বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত গবেষক এবং জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মতে, ইসরায়েলের এই বর্বরতা স্পষ্টতই ‘গণহত্যা’র শামিল।
সূত্র: আল-জাজিরা
