চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে উত্তর কোরিয়া এমন এক প্রতিবেশী, যাকে চীন যেমন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আবার হাতছাড়া করাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।
কোরীয় যুদ্ধের কথা স্মরণ করে দুই দেশই প্রায়শই তাদের সম্পর্ককে ‘রক্তের বন্ধনে গড়া’ বলে অভিহিত করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্পরিক অবিশ্বাস এই সম্পর্কে কিছুটা ফাটল ধরিয়েছে। আর এখন বেইজিং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ চরম অনিশ্চিত এই প্রতিবেশীর ওপর নিজেদের প্রভাব পুনর্বহাল করতে চাইছে।
চীন মূলত তার সীমান্তে স্থিতিশীলতা এবং পিয়ংইয়ংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে তৈরি হওয়া কোনো সংকটে জড়াতে তারা নারাজ। তাই চলতি সপ্তাহে শি জিনপিংয়ের এই উত্তর কোরিয়া সফরটি বন্ধুত্বের চেয়ে নিজেদের প্রভাব বা ‘লেভারেজ’ বিস্তারের চেষ্টাই বেশি।
সিউলের ধারণা, শি জিনপিং চীনকে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে পারেন। তবে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্য হয়তো অন্য কিছু। পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, পিয়ংইয়ং ও মস্কোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব নিয়ে বেইজিংয়ের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর, শি জিনপিং এখন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান; বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন বেইজিং বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি আরও বাড়াচ্ছে।
বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার সম্পর্কের শীতলতা স্পষ্ট না হলেও তা ছিল বেশ সূক্ষ্ম। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী তারা বেশ সাদামাটাভাবেই উদযাপন করেছে। জনসমক্ষে দেওয়া বার্তাগুলোও ছিল বেশ সংযত।
এর আগের মাসে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নেননি চীনের রাষ্ট্রদূত। পুরো বছরজুড়ে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কোনো সফর বিনিময় হয়নি, যা মস্কোর সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ক্রমবর্ধমান উষ্ণ সম্পর্কের ঠিক বিপরীত চিত্র। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার এই ঘনিষ্ঠতা বেইজিংকে ভাবিয়ে তুলেছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর, উত্তর কোরিয়া পুতিনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে পুতিনের পিয়ংইয়ং সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মাধ্যমে এই সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। বিবিসির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায় ২,৩০০ উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছে। এছাড়া তেল ও সহায়তার বিনিময়ে পিয়ংইয়ং রাশিয়াকে গোলাবারুদ সরবরাহ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টি ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের আশঙ্কিত করার পাশাপাশি চীনকেও নিঃশব্দে ভাবিয়ে তুলেছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর পারমাণবিক নীতি বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত পান্ডা বলেন, ‘মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের দ্রুত কাছাকাছি আসার এই সময়ে চীন উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।’
পুরো বিশ্বে চীনের আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে কেবল একটি দেশের সঙ্গে, আর সেটি হলো উত্তর কোরিয়া। ফলে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর রাশিয়ার আধিপত্য তৈরি হোক, তা বেইজিং কখনই চাইবে না। কিম জং উন যদি স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেন, তবে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কমে যাবে।
এর জবাবে বেইজিং সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করেছে। গত বছরের শেষের দিকে শি জিনপিং কিম জং উনকে বেইজিংয়ে একটি সামরিক প্যারেডে আমন্ত্রণ জানান এবং পুতিনের পাশাপাশি কিমকেও নিজের পাশে গুরুত্বের সাথে রাখেন। ছয় বছরের মধ্যে এটিই ছিল তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে শি জিনপিং দুই দেশকে ‘একই ভাগ্যে বাঁধা ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু এবং ভালো কমরেড’ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সমন্বয়ের আহ্বান জানান। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাদের প্রকাশ্য বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এশিয়া সেন্টারের ভিজিটিং স্কলার লি সং-হিয়ন বলেন, পিয়ংইয়ং ও মস্কোর ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব নিয়ে বেইজিংয়ের মনে ‘মিশ্র অনুভূতি’ রয়েছে। একদিক থেকে এই অংশীদারিত্ব ওয়াশিংটনের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং একাধিক ক্ষেত্রে মার্কিন কৌশলকে জটিল করে তোলে, যা পরোক্ষভাবে চীনের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু অন্যদিকে, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বর্ধিত সামরিক সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে আরও জোরালো ত্রিপক্ষীয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে, যা বেইজিংয়ের জন্য চিন্তার কারণ।
ঠিক এই কারণেই চীন পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সমর্থন করছে না- কারণ এর ফলে এই অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি এবং তাদের জোটের তৎপরতা আরও বাড়বে। তবে চীন এই সমস্যার সরাসরি বিরোধিতাও করছে না। ২০২২ সালে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের আনা একটি প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে ভেটো দিয়েছিল।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পররাষ্ট্র নীতি বিভাগের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর চা বলেন, চীন যদি পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তবে ‘তা উত্তর কোরিয়াকে পুতিনের কোলে আরও বেশি ঠেলে দেবে।’
কিম জং উনও তার সবচেয়ে বড় সহায়তার উৎস চীনকে হাতছাড়া করতে পারেন না। গত বছর উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারে (১.৭ বিলিয়ন পাউন্ড) গিয়ে ঠেকেছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের শুরুর দিকে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিসও পুনরায় চালু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটিও পিয়ংইয়ংক নিজেদের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনার জন্য বেইজিংয়ের একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস।
কিমের জন্য এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে উত্তর কোরিয়ার সহায়তার প্রতি রাশিয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে যেতে পারে। তাছাড়া একঘরে হয়ে পড়া পুতিনের তুলনায় শি জিনপিং বেইজিংয়ে বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানাচ্ছেন। তাই কিমকে নিশ্চিত করতে হবে যেন তিনি কোনো দুর্বল হতে থাকা সঙ্গীর ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হয়ে না পড়েন।
তবে এই সম্পর্কের শুরুটা কিন্তু মসৃণ ছিল না। কিম জং উন যখন ক্ষমতা পান, তখন তার অগ্রাধিকারগুলো ছিল তার বাবার চেয়ে ভিন্ন। তার বাবা কিম জং ইল বারবার চীন সফর করতেন এবং বেইজিংয়ের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু কিম জং উন ক্ষমতায় এসেই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও বেগবান করেন। ক্ষমতার প্রথম ছয় বছরে তিনি প্রায় ৯০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং চারটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটান—যা তার বাবা ও দাদার আমলের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।
এটি বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরপর কিমের ফুফা জং সং থায়েক- যাকে চীন উত্তর কোরিয়ার স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখত- তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে দুই দেশের দূরত্ব আরও বাড়ে। শি জিনপিংও বিরল কূটনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশ করে কিমের সাথে দেখা করার আগেই ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন; যা কিমকে অবজ্ঞা করার শামিল হিসেবে দেখা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়াও এর জবাবে চীনকে ‘বিশ্বাসঘাতক এবং শত্রু’ বলে আখ্যা দেয়।
পরবর্তীকালে ২০১৮ সালে যখন পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে নিষেধাজ্ঞাগুলো উত্তর কোরিয়ার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে, তখন কিম জং উন তার প্রথম পরিচিত বিদেশ সফরে বের হন। তিনি তার সাঁজোয়া ট্রেনে চেপে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেই বৈঠকটি ছিল সম্পর্ক নতুন করে ঝালাই করার সূচনা। এরপর কিম মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও, তা সবসময়ই করেছেন চীনের সঙ্গে পরামর্শের পর। বার্তাটি পরিষ্কার ছিল: বেইজিংয়ের সমর্থন ছাড়া পিয়ংইয়ং কোনো আলোচনা করবে না।
বর্তমানে উত্তর কোরিয়া চীনের জন্য একাধারে একটি বাফার জোন (নিরাপত্তা বলয়) এবং একটি বড় বোঝা। এটি মার্কিন বাহিনীকে চীনের সীমান্ত থেকে দূরে রাখছে ঠিকই, কিন্তু এর অস্ত্র পরীক্ষাগুলো এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। অন্যদিকে, কিম চীনের সুরক্ষা চান- তবে চীনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই।
উভয় পক্ষই একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা দুজনেই মনে করে যে তাদের একে অপরকে প্রয়োজন, আর সম্পর্ক ও আলোচনা টিকিয়ে রাখার জন্য আপাতত এটুকুই যথেষ্ট।
সূত্র: বিবিসি
