ঋণখেলাপির অভিযোগকে ‘বারবার বলা মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে তা নাকচ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, তার সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান কখনো উৎপাদন বা রপ্তানি বন্ধ করেনি, কর্মীদের বেতন বকেয়া রাখেনি এবং ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ মওকুফও চায়নি।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নত্তোরে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় গভর্নর বলেন, অনেক সময় একটি অভিযোগ বা বক্তব্য বারবার প্রচার হতে হতে সেটিকে সত্য বলে মনে হয়। তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির যে অভিযোগ তোলা হয়, তা সঠিক নয়। তিনি জানান, তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শত কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সুদের হার ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশে ওঠা, কোভিড-১৯ মহামারি এবং অন্যান্য কারণে ঋণ পরিশোধে কিছু বিলম্ব হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কখনো ঋণখেলাপি হয়নি।
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে গভর্নর বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ছিল। তার ভাষায়, ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেরিয়ে গেছে। ফলে প্রথমেই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার দিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকে তারল্যসংকট রয়েছে। তবে এসব ব্যাংকের সমস্যা নতুন নয়; আগের সরকারের সময় থেকেই সেগুলো সংকটে ছিল। ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর গৃহীত একটি বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় এসব ব্যাংকের পরিশোধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংক ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো সংকট নেই। কিছু ব্যাংকে সীমিত সমস্যা রয়েছে এবং সেসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে বিকল্প বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে গভর্নর বলেন, সরকার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে, যা নিয়মিত কাজ করছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, আন্তর্জাতিকভাবে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের সাফল্যের হার খুবই কম। বিশ্বব্যাপী এ হার ২ শতাংশেরও নিচে এবং অর্থ ফেরত আনতে সাধারণত সাত থেকে দশ বছর সময় লাগে।
তারপরও সরকার এ প্রচেষ্টা থেকে সরে আসবে না বলে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত করে ফ্রিজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে এবং প্রায় ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি একটি যৌথ তদন্ত দল নিয়মিত বৈঠক করছে।
গভর্নরের দাবি, ইতোমধ্যে কিছু অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উপযুক্ত সময়ে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, যারা দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে, তাদের কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। আইনি ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।