ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে কোণঠাসা নেতানিয়াহু

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:২০ এএম

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক ভয়াবহ রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এই ঘটনাটি নেতানিয়াহুর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তিনটি মূল স্তম্ভকে চুরমার করে দিয়েছে এবং তাকে এক গভীর ও জটিল নিরাপত্তা সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

নিজেকে ওয়াশিংটনের ‘রাজনৈতিক পরামর্শদাতা’ হিসেবে দাবি করা এবং মার্কিন রাজনীতিকদের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী নেতানিয়াহু বর্তমানে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রধান মিত্র কর্তৃক প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে তাকে কার্যত সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ইসরায়েলি রাজনীতিতে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প রবিবার বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার তীব্র সমালোচনা করে নেতানিয়াহুর বিচারবুদ্ধি নিয়ে যে কড়া মন্তব্য করেছেন, তা ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলোর হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে। আগামী অক্টোবরের আগে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুকে চরম চাপের মুখে ফেলেছে।

নেতানিয়াহু তার পুরো রাজনৈতিক জীবনে নিজেকে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বা নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে তার আগ্রাসী নিরাপত্তা নীতি শেষ পর্যন্ত উল্টো ফলাফল নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শেষে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তদুপরি, তেহরানের পক্ষ থেকে এমন দাবি তোলা হয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি কেবল গাজায় নয়, বরং লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে কার্যকর করতে হবে। এটি নেতানিয়াহুর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্পের চুক্তি ইসরায়েলকে মানতে বাধ্য নয়। তিনি বলেন, ‘যে চুক্তি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, আমরা তার অংশ নই।’ লিকুদ পার্টির আইন প্রণেতা অ্যারিয়েল কালনারও সুর মিলিয়েছেন, তবে ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যাবে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি।

বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ নেসেটে (ইসরায়েলের পার্লামেন্ট) সোমবার বলেছেন, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথ খোলা- হয় প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক বিরোধে জড়ানো, অথবা ইসরায়েলি স্বার্থের নতিস্বীকার করা। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজে রহস্যজনকভাবে নীরবতা পালন করছেন। সাধারণত বিজয় দাবি করতে অভ্যস্ত নেতানিয়াহুর এই নীরবতাকে অনেকেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তার চরম দ্বিধার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহু ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনেন। তিনি ‘আগ্রাসী এবং আগাম আক্রমণের’ কৌশল গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রায় ৮ মাস পরেও সেই কৌশলের ফলাফল হতাশাজনক। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারালেও গাজার অর্ধেক এলাকায় হামাস এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এদিকে মার্কিন মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ও গাজা প্রশাসনের বিষয়টি স্থবির হয়ে আছে।

বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখল করে রাখলেও সামরিক সক্ষমতা ও রিজার্ভ সেনাদের ওপর এটি ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেন, ‘লেবাননে কী ঘটবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা ইরানকে দিয়ে দেওয়া মানে হলো, হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করা।’

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ মনে করেন, নেতানিয়াহুর বর্তমান কৌশলের ব্যর্থতা তেহরানের প্রতি নতুন করে বাস্তবমুখী ও সংযত নীতি গ্রহণের দাবি জানায়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওবামা প্রশাসনের সময় নেতানিয়াহু যেভাবে কংগ্রেস ও মার্কিন জনমতকে কাজে লাগিয়ে হোয়াইট হাউসকে পাশ কাটিয়ে চলতেন, বর্তমান বাস্তবতায় সেই সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

এখন বড় প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলের ভোটারদের কাছে নেতানিয়াহুর সেই চিরচেনা ‘নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতির’ আদৌ কোনো মূল্য অবশিষ্ট আছে কি না। মিত্র ও শত্রুর মাঝখানে আটকা পড়া নেতানিয়াহু এখন নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচানোর লড়াইয়ে মরিয়া, যেখানে সামনে কেবল পরাজয় অথবা আত্মসর্মপণের মতো কঠিন বিকল্পই বিদ্যমান।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত