প্রধান আসামি আবীরের মৃত্যুদন্ড জার্সি পরে আদালতে বন্ধু-স্বজন

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

আদালত কক্ষে তখন বহুল আলোচিত আলিনা ইসলাম আয়াত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা চলছে। বিচারক যখন প্রধান আসামি আবীর আলীর মৃত্যুদ-ের আদেশ দেন, তখন স্বস্তি আর কান্না একসঙ্গে ভর করে উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীদের। তবে গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দৃশ্য ছিল একদল শিশু ও কিশোরকে ঘিরে। তাদের সবার গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি। বয়স ৯ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। তারা আয়াতের বন্ধু-স্বজন, খেলার সাথী, প্রতিবেশী। যেন তারা সবাই খুঁজছিল অনুপস্থিত ছোট্ট আয়াতকে। রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তারা। কেউ আয়াতের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরেন, কেউ নীরবে চোখ মুছেন, কেউ কেউ ক্ষোভ জানিয়ে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান।

কেন আর্জেন্টিনার জার্সি? এ প্রশ্নের উত্তরেই উঠে আসে পাঁচ বছর বয়সী আয়াতের এক অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প। ২০২২ সালের নভেম্বরে কাতার বিশ্বকাপ শুরুর উন্মাদনা চলছিল। সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের মানুষও তখন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। সেই উন্মাদনার ছোঁয়া লেগেছিল ছোট্ট আয়াতের মনেও। খেলা পুরোপুরি না বুঝলেও আর্জেন্টিনা দলকে ঘিরে ছিল তার আলাদা আগ্রহ। বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য বায়না করেছিল সে। মেয়ের আবদার রাখতে জার্সি কিনে দিয়েছিলেন বাবা সোহেল রানা। নতুন জার্সি পরে বল হাতে, বল পায়ে নানা ভঙ্গিতে ছবিও তুলেছিল আয়াত। কিন্তু সেই আনন্দ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর নির্মমভাবে তাকে খুন করে মরদেহ ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এর চার দিন পরেই ছিল আর্জেন্টিনার ম্যাচ, সেই খেলা দেখার আগেই তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। 

রায়ের পর আয়াতের বাবা সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজকে আয়াতের সমবয়সী ফারাজ, সুমাইয়াকে দেখে বারবার মনে হচ্ছে আমার মেয়েটাও যদি বেঁচে থাকত, তাহলে ওদের সঙ্গে বিশ্বকাপ খেলা দেখত, হইচই করে মাতিয়ে রাখত। গতকালও আর্জেন্টিনার খেলা ছিল। ও থাকলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের সঙ্গে খেলা দেখত। ও খেলা খুব একটা বুঝত না, কিন্তু খেলা দেখতে খুব পছন্দ করত। আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য আবদার করেছিল। আমি কিনেও দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই আনন্দ বেশি দিন টিকল না।’ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহেল রানা। বলেন, ‘আদালতের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা দ্রুত রায় কার্যকর দেখতে চাই।’

আয়াতের মা তামান্না বলেন, ‘জার্সি পেয়ে অনেক খুশি হয়েছিল আয়াত! জার্সি পরে বল হাতে, বল পায়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলেছিল। বারবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল। সেই ছবিগুলো মাঝে মাঝে দেখি আর অশ্রু মুছি। একটা বিশ্বকাপ শেষ হয়ে আরেকটা বিশ্বকাপ চলে এসেছে। কিন্তু আমার মেয়েটা আর নেই। অন্য বাচ্চারা বড় হচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে, খেলাধুলা করছে। কিন্তু আমার আয়াতের জীবন পাঁচ বছর বয়সেই থেমে গেছে।’

আদালতে উপস্থিত আয়াতের চাচাতো ভাই আনাস বলেন, ‘আয়াত খেলাধুলা পছন্দ করত। কাতার বিশ্বকাপের  সময় আর্জেন্টিনার খেলা দেখবে বলে জার্সি নিয়েছিল। জার্সি পরে এসে আমাদের দেখিয়ে বলেছিল ‘দেখো, আমি আর্জেন্টিনা।’ সেদিনের তার মুখের হাসিটা এখনো চোখে ভাসে। তাকে হত্যার চার দিন পরই আর্জেন্টিনার ম্যাচ ছিল। আজকে তার স্মরণে আমরা কাজিনরা, তার বন্ধুরা সবাই আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আদালতে এসেছি। যেন সবাই জানে, আয়াত শুধু একটি চাঞ্চল্যকর মামলার নাম নয়; সে ছিল স্বপ্নভরা একটি শিশু।

প্রতিবেশী সুফিয়ানা বলেন, ‘আজকে যারা আর্জেন্টিনার জার্সি পরে এসেছে, তাদের অনেকেই আয়াতের সঙ্গে খেলাধুলা করত। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, আয়াতও যেন তাদের মাঝখানে কোথাও আছে। আমরা তাকে ভুলিনি।’

গতকাল বুধবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে ষষ্ঠ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস আসামি আবীর আলীকে মৃতুদ- দেন। এ ছাড়া লাশ টুকরো টুকরো করে গুমের অপরাধে তাকে পাঁচ বছরের কারাদ- এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে, অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদ- দেওয়া হয়। মামলায় ৫০ সাক্ষীর মধ্যে ৩৩ জনের সাক্ষ্য নিয়ে আদালত রায় দিয়েছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস, নির্মম ও সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী।

২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর নগরের ইপিজেড থানার নয়ারহাট ওয়াছ মুন্সী বাড়ি এলাকায় আরবি পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় আয়াত। পরে পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণের পর প্রতিবেশী আবীর আলী (২৩) তাকে হত্যা করে। পরে লাশ ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। ঘটনার ১৬ দিন পর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় আয়াতের দেহাবশেষ। দন্ডিত আবীর আলীর বাড়ি রংপুর জেলায়। তিনি দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের নয়ারহাট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ভিকটিম আয়াতের বাড়িও সেখানে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত