ফরাসি সৌরভের চূড়ায় এমবাপ্পে

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৬:১৫ এএম

রিয়াল মাদ্রিদে কাটানো ট্রফিশূন্য এক মৌসুমের হতাশা কিংবা ঘরের মাঠে ফরাসি সমর্থকদের সমালোচনা! সব কিছু যেন এক ফুৎকারে উড়ে গেল বিশ্বমঞ্চের আলো ঝলমলে আলোয়। কারণ, টুর্নামেন্ট বা দল যা-ই হোক না কেন, ‘বিশ্বকাপের এমবাপ্পে’ সবসময়ই অনন্য, অপ্রতিরোধ্য। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা লামিন ইয়ামালরা যেখানে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দলকে জেতাতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে দেখালেন কীভাবে একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে হয়। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সেনেগালের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়ে জোড়া গোল করে অলিভিয়ের জিঁরু ও কিংবদন্তি পেলেকে পেছনে ফেলে ফরাসি ফুটবলে এক নতুন মহাকাব্য রচনা করলেন ২৭ বছর বয়সী এই সুপারস্টার।

ম্যাচের প্রথমার্ধে ফ্রান্সের পারফরম্যান্স ছিল বেশ মলিন। আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগালের প্রেসিংয়ের সামনে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা একপ্রকার ভাগ্যবশত সমতায় থেকে বিরতিতে যায়। এমবাপ্পেও প্রথমার্ধে কিছুটা জড়তায় ভুগছিলেন। তবে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামেন এক অন্য এমবাপ্পে। যার গতি আর চতুরতার সামনে এবার যেন খেই হারিয়ে ফেলে সেনেগালের রক্ষণভাগ। উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল অলিসের মতো তারকারা যখন মাঠের খেলায় এমবাপ্পের জন্য নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছিলেন, তখনই বোঝা যাচ্ছিল ফরাসি ফুটবলে এই তরুণের প্রভাব কতটা গভীর।

ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে মাইকেল অলিসের নিখুঁত পাস থেকে বল পেয়ে বক্সে ঘূর্ণায়মান শটে সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্দির পাশ দিয়ে প্রথম গোলটি করেন এমবাপ্পে। এই গোলের মাধ্যমে তিনি ওলিভিয়ের জিঁরুর রেকর্ড ৫৭ গোল ছুঁয়ে ফেলেন। তবে আসল চমক বাকি ছিল ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, ইনজুরি টাইমে। পিএসজির তরুণ তুর্কি ইব্রাহিম এমবায়ে সেনেগালের হয়ে এক গোল শোধ করার পর এমবাপ্পে যেন আরও তেতে ওঠেন। খেলা শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে এক দুর্দান্ত ‘থান্ডারবোল্ট’ শটে বল জালে জড়ান তিনি, যা ছিল ২০০৯ সালে পোর্তোর বিপক্ষে তার আদর্শ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর করা বিখ্যাত গোলটির এক জীবন্ত অনুলিপি। এই দ্বিতীয় গোলের সঙ্গে সঙ্গেই মাত্র ৯৯ ম্যাচে ৫৮ গোল নিয়ে জিঁরুকে টপকে ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা বনে যান এমবাপ্পে।

এই জোড়া গোল এমবাপ্পেকে শুধু ফ্রান্সেরই শীর্ষে তোলেনি, বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসেও তার নাম নতুন করে লিখিয়েছে। মাত্র দুটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকাপ ও ২০২৬ আসরের প্রথম ম্যাচ মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চে এমবাপ্পের গোল সংখ্যা এখন ১৪। তিনি স্পর্শ করেছেন জার্মানির কিংবদন্তি জার্ড মুলারকে এবং পেছনে ফেলে দিয়েছেন ১২ গোল করা ফুটবল সম্রাট পেলেকেও। এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডধারী লিওনেল মেসি মিরেস্ল্যাভ ক্লোসাকে ছুঁতে তার প্রয়োজন কেবল ২ গোল।

বিশ্বকাপে তারকাখচিত এই রাতে মেসি-হালান্ডের আগে অনন্য সব কীর্তি গড়ে হেডলাইন বনে গেছেন এমবাপ্পেও। তবে ম্যাচ শেষে নিজের এই অবিস্মরণীয় কীর্তি নিয়ে এমবাপ্পে বেশ শান্ত গলায় বলেন, ‘আমি খবরের কাগজে নাম লেখানোর জন্য খেলি না। আমি খেলি আমার দেশের ইতিহাসে নিজের ছাপ রেখে যেতে, দলকে ফাইনালে তুলতে এবং বিশ্বকাপ জিততে।’

এদিকে বিবিসির লাইভ অনুষ্ঠানে সাবেক সতীর্থ জিঁরু নিজের রেকর্ড ভাঙায় এমবাপ্পেকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘অভিনন্দন কিলিয়ান। এটা প্রত্যাশিতই ছিল। ও দেশের হয়ে অনায়াসে ১০০ গোল করবে এবং বিশ্বকাপের সব রেকর্ড ভেঙে দেবে।’ সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনিও এমবাপ্পের প্রশংসা করে বলেন, ‘এমবাপ্পে একজন খাঁটি সুপারস্টার। কোনো সন্দেহ নেই যে, এই টুর্নামেন্ট শেষ হতে হতে ও বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হয়ে উঠবে।’

শৈশবে প্যারিসের শহরতলি বঁদিতে জন্ম নেওয়া এমবাপ্পের জন্য এই সাফল্য অবশ্য আকস্মিক কিছু নয়। তিন বছর বয়সেই যিনি ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত মুখস্থ করেছিলেন কেবল একদিন বিশ্বমঞ্চে গাইবেন বলে, সেই এমবাপ্পে এখন সত্যিই ফরাসি ফুটবলের অদ্বিতীয় নেতা। আগামী ২৩ জুন ফিলাডেলফিয়াতে ইরাকের বিপক্ষে শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক ফুটবলের এই অন্যতম মহাতারকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত