বজ্রপাত বাড়ছে যে কারণে

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

আকাশে কালো মেঘ জমলেই বৃষ্টির সঙ্গে মৃত্যুর শঙ্কা বাড়ে। এ শঙ্কা বজ্রপাতে মৃত্যুর। বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন এক নীরব ঘাতক। বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছর বজ্রপাতে ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, আহত হন অনেকেই। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে, উন্মুক্ত মাঠে, নদীতীরবর্তী এলাকায় কৃষিকাজে নিয়োজিত মানুষেরা সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণে বজ্রপাত বাড়ছে বলে মনে করেন আবহাওয়া ও পরিবেশবিদরা।

গত ১১ জুন একদিনে দেশের ১১ জেলায় বজ্রপাতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৭ এপ্রিল একদিনে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ দুদিনের প্রাণহানিই দেশে বজ্রপাতের ভয়াবহতার চিত্র স্পষ্ট করে। প্রতি বছর বজ্রপাতে ৩০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। মৃত্যুর শিকার পরিবারগুলোতে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তি মারা গেলে ওই পরিবারে নেমে আসে চরম দুঃখ ও হতাশা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা এবং এর তীব্রতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর পেছনে জলবায়ুর পরিবর্তন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তাদের মতে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করে। মেঘে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের পার্থক্য বাড়লে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাসে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কালবৈশাখীর সময় মেঘে বিদ্যুতের প্রবাহ তৈরি হয় এবং তা বজ্রপাতের মাধ্যমে ভূমিতে নেমে আসে। কয়েক সেকেন্ডের এ প্রাকৃতিক ঘটনা মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।

তিনি বলেন, নগরায়ণ, বন উজাড় হওয়া এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে বজ্রপাতের প্রকৃতি ও তীব্রতায় পরিবর্তন এসেছে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বজ্রপাতের সময়কালও দীর্ঘ হচ্ছে। আগে মার্চ-এপ্রিলকে বজ্রপাতের মৌসুম ধরা হতো। এখন সময়সীমা বেড়ে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বৃষ্টিপাত বেশি হলে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ে। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। সচেতনতাই কার্যকরী প্রতিরোধ।

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণহানি হয় ও কৃষিজীবী মানুষের ঝুঁকি বাড়ে এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে বজ্রপাত দেশের অন্যতম দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।

তিনি জানান, বিগত শতকের নয়ের দশকে দেশে বজ্রপাতে বছরে গড়ে ৩০ জনের মৃত্যু হতো। এখন তা বেড়ে ৩০০-৩৫০ জনে পৌঁছেছে। ২০২০ সালে বজ্রপাতে মারা যান ৪২৭ জন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এটি নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দেবনাথ জানান, দেশে চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৫৫ জন আহত হয়েছে। বজ্রপাতে গত ১০ বছরে ৩ হাজার ৩৯৮ জন মারা গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ২৭১ জন মারা গেছে। চলতি বছর মারা গেছে ১২৭ জন। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ৩৯৮ জন মারা গেছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত আহতের হিসাব পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সাল থেকে গত রবিবার পর্যন্ত ৬৩০ জন মানুষ আহত হয়েছে। বছরে গড়ে ৩০০ জনের বেশি নিহত ও অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন।

২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ৪০১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ওই বছর ১০৮ আহত হয়েছে; ২০২০ সালে ৪২৭ জনের মৃত্যু ও ৮৮ জন আহত; ২০২১ সালে ৩৬৩ জনের মৃত্যু ও ১২৪ জন আহত; ২০২২ সালে ৩৩৭ জনের মৃত্যু ও ৮৭ জন আহত; ২০২৩ সালে ৩২২ জনের মৃত্যু ও ৬১ জন আহত; ২০২৪ সালে ২৬৬ জনের মৃত্যু ও ৫৩ জন আহত; ২০২৫ সালে ২৪৩ জনের মৃত্যু ও ৫৪ জন আহত এবং এ বছর ১২৭ জনের মৃত্যু ও ৫৫ জন আহত হয়েছে।

কেন বজ্রপাত বাড়ছে : আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশীদ জানান, বাংলাদেশে বজ্রপাত বাড়ার একাধিক কারণ রয়েছে। যেমন জলবায়ুর পরিবর্তন, আর্দ্রতা বাড়ায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহ এবং বড় গাছ কমে যাওয়া। ভূপৃষ্ঠের গরম বাতাস দ্রুত উপরে উঠে যায় এবং শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি করে। এই মেঘ থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বজ্রপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

আরকেটি কারণ হলো দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ। অতিরিক্ত গরমে নদী-খাল ও জলাশয় থেকে বেশি জলীয়বাষ্প সৃষ্টি হয়, যা বজ্রমেঘকে আরও শক্তিশালী করে। এতে বজ্রপাত হয়। 

আমাদের বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস এবং স্থানীয় জলীয়বাষ্প মিলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়। এতে বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়ে।

তারপর বড় গাছ কমে যাওয়াও একটি কারণ। গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছপালা কেটে ফেলার ফলে বজ্রপাতের স্বাভাবিক টার্গেট কমে গেছে। ফলে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক বা জেলেরা বজ্রপাতের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া জলাভূমি ও ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, বন উজাড় এবং বায়ুদূষণও বজ্রপাত বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

বাড়তে পারে বজ্রপাত : অধ্যাপক ড. মজুমদার বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে তাপ ও আর্দ্রতা বাড়ছে, যা শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে। জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে বজ্রপাতের ঘটনা ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব আরও বাড়বে। অসময়ে কালবৈশাখী এবং তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। বজ্রপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, হাওর এলাকা, নদীবিধৌত অঞ্চল এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ভবিষ্যতেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচিত হবে।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা : আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, বজ্রপাতকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে জননিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও আধুনিক বজ্রপাত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বজ্রপাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম সতর্কতা এবং সঠিক আচরণ। তার পরামর্শ: আকাশে কালো মেঘ, বিদ্যুৎ চমকানো বা বজ্রধ্বনি শুনলেই দ্রুত নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠে, ধান ক্ষেতে, হাওরে, নদী-বিল-জলাশয়ে অবস্থান করা যাবে না। বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং কৃষিকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত। আশ্রয় না পেলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে, তবে মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল বা খোলা ট্রাক্টরে থাকলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে।

ঘরের ভেতরে থাকলেও সতর্ক থাকতে হবে। বজ্রঝড়ের সময় টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার, রাউটারসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখা উচিত। তারযুক্ত টেলিফোন ব্যবহার না করাই ভালো। ধাতব পাইপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হতে পারে বলে এ সময় গোসল করা, বাসন মাজা বা ট্যাপের পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।

বজ্রপাত মোকাবিলায় সরকার দেশের বিভিন্ন এলাকায় তালগাছসহ অন্যান্য উঁচু গাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রচার করছে। মোবাইল ফোনে খুদে বার্তায়, গণমাধ্যমের প্রচারণায় ও স্থানীয় প্রশাসনের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করার চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সতর্কতা প্রচার নয়, বজ্রনিরোধক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সচেতনতার অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবে বজ্রপাত ভয়াবহ প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত