ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুস সাদেক আর নেই

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি খেলোয়ার ও সংগঠক আবদুস সাদেক মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দূরারোগ্য ক্যানসারের সঙ্গে প্রায় দেড় বছর লড়াই করে আজ শনিবার (২০ জুন) তিনি রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মরহুমের প্রথম জানাজা আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাজা আগামীকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানীরওল্ড ডিওএইচএস মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।

প্রসঙ্গত, আবদুস সাদেকের ছোট ভাই দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। এছাড়া মরহুমের বড় ছেলে টি স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ইশতিয়াক সাদেক।

অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের তারকা খেলোয়ার ছিলেন আবদুস সাদেক। ফুটবল ও ক্রিকেটেও ছিলেন সমান পারদর্শী।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের (ঢাকা আবাহনী লিমিটেড) প্রথম ফুটবল অধিনায়ক ও হকি অধিনায়ক ছিলেন তিনি। শুধু তারকা খেলোয়াড়ই নন, তিনি ছিলেন সফল কোচ ও সংগঠকও। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর চরম দুঃসময়ে আবাহনীকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। 

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদান রাখায় ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন আবদুস সাদেক। বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ব্রিটিশ আমলে ছিলেন খ্যাতনামা সাঁতারু।

তাঁর ছোট ভাই দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানও এক সময়ে ছিলেন হকির তারকা খেলোয়াড়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পরপরই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের রোষানলে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালির মেধা-মনন বিকাশের সুযোগ ছিল না বললেই চলে। সেই বৈরী পরিবেশেও পাকিস্তানের জাতীয় হকি দলে ডাক পান আবদুস সাদেক। এমনকি ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক দলেও ডাক পেয়েছিলেন। তবে ইনজুরির কারণে খেলা হয়নি। 

পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে তিনি ইউরোপ সফর করেন। ১৯৬৯ সালে দেড় মাসের ইউরোপ ট্যুরে আবদুস সাদেকরা জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং ইংল্যান্ডে খেলেছেন। ফেরার পথে মিসরের সঙ্গেও একটা ম্যাচ খেলেছেন। সেই ইউরোপ ট্যুরে মাঠে ক্যারিশমা দেখানোর কারণে আবদুস সাদেক দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে দলের সেরা তারকা রশিদ জুনিয়রের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান দলের সেরা তারকারাও ইংরেজি জানতেন না। তবে আব্দুস সাদেক জানতেন। এ কারণে সবার কাছে তাঁর কদর ছিল আলাদা।

শুধু আব্দুস সাদেকই নন, তাঁর ছোট ভাই আহমেদ আকবর সোবহানও হকিতে বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন। হকিতে রাইট হাফে খেলতেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান যুবদলে দুই ভাই একসঙ্গে খেলেছেন। স্বাধীনতার পর জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন আব্দুস সাদেক। ফাইনালে তাঁর ছোট ভাইয়ের একমাত্র গোলেই কুমিল্লা সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

আবাহনীর প্রথম ফুটবল ও হকি অধিনায়ক


স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের। ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল একজন সুযোগ্য নেতা খুঁজছিলেন নতুন দলকে পরিচালনার জন্য। তিনি বেছে নেন দেশের সেরা তারকাকে। আবদুস সাদেক স্বাধীনতার আগে ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশার মতো জনপ্রিয় ক্লাবে খেলে বেশ নাম কুড়িয়েছিলেন। শেখ কামাল ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলের নেতৃত্বের ভার তুলে দেন তাঁর কাঁধে। হকিতে আবাহনীকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করে আস্থার প্রতিদান দেন।

আব্দুস সাদেক ক্যারিশমায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন আবাহনী

ফুটবল ক্যারিয়ার ছেড়ে ১৯৭৭ সালে আবাহনী প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নেন আব্দুস সাদেক। নতুন দায়িত্ব পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। সেবার লিগে কোনো ম্যাচেই হারেনি আবাহনী। তিন ম্যাচ ড্র ছাড়া বাকি সব ম্যাচেই দাপুটে জয়। বাংলাদেশে প্রথম দল হিসেবে আবাহনী অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করে। স্বাধীন বাংলাদেশে সেবারই প্রথম কোনো দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

সফল সংগঠক

প্রশিক্ষকের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর সংগঠক হিসেবে আব্দুস সাদেকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকি অনুষ্ঠিত হয়। অথচ ওই বছরের আয়োজক হওয়ার কথা ছিল জাপানের। এশিয়ান হকি ফেডারেশনের বৈঠকে সাদেকের কথায় মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের সমর্থনে আয়োজকের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের হকি বা ফুটবলে যখনই সমস্যা দেখা গেছে তিনি প্রথমে এগিয়ে এসেছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশে এমন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সালে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ হকির আসর বসে। এখানেও বড় ভূমিকা রাখেন আব্দুস সাদেক। হকির ফ্লাডলাইট, ইলেকট্রনিক স্কোর বোর্ডসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি এসেছে তাঁর প্রচেষ্টায়। ঢাকায় আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের সভাপতি নেগ্রে আসার পর প্রথম দেখায় আব্দুস সাদেককে চিনে নেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সাদেক একজন কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড়। আমার বিশ্বাস, সাদেকের হাত ধরে হকির উন্নয়ন সম্ভব হবে।’

আবাহনীর দুঃসময়ের কাণ্ডারি

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আবাহনী ক্লাব টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। অনেকে তখন ভয়ে ক্লাবে আসতেন না। এমনকি অনেক সংগঠক বিদেশেও চলে যান। কিন্তু এ দুঃসময়ে শেখ কামালের হাতে গড়া আবাহনীকে টিকিয়ে রাখার গুরুভার কাঁধে তুলে নেন আব্দুস সাদেক। ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে তিনি সবাইকে নিয়ে আবাহনীকে মাঠে নামানোর নেতৃত্ব দেন। বিপদের সময় তাঁর সাহসিকতার কারণে হয়ত মাথা উঁচু করে টিকে আছে আজকের আবাহনী। আব্দুস সাদেকের অসামান্য অবদানের কথা চিন্তা করে আবাহনী লিমিটেড তাঁকে করেছে ‘আজীবন সদস্য’। ক্রীড়াঙ্গনের এই জীবন্ত কিংবদন্তির জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ক্রীড়া পরিবারে।

বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের নেতৃত্বে

১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে হকিতে প্রথম জাতীয় দল গঠন করা হয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন টেস্টে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন আব্দুস সাদেক। সেখানে হকি টেস্টে একটিতে জয়, একটিতে ড্র ও একটিতে পরাজিত হয় বাংলাদেশ। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ প্রথম এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়। হকিতে আব্দুস সাদেকই অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত