ক্রীড়াঙ্গনের এক নক্ষত্রের বিদায়

আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০২:২১ এএম

নিভে গেল একটি তারকা। যে নক্ষত্রটি জ¦লজ¦ল করছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের আকাশে। যে বটবৃক্ষের ছায়ায় শীতল পরশ পেত ক্রীড়াঙ্গন। ফুটবল-হকি খেলার পাশাপাশি সংগঠক হিসেবেও ছিলেন সমান পারদর্শী। সেই সব্যসাচী ক্রীড়াবিদ আবদুস সাদেক আর নেই। দীর্ঘদিন প্রাণঘাতী ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ... রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। গতকাল বাদ আসর বসুন্ধরার বায়তুস সোবহান মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আজ বনানীর ডিওএইচএস মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ১০টায়। 

দেশের হকি ও ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ ছিলেন আবদুস সাদেক। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক এবং জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন, সাবেক খেলোয়াড়, কোচ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা গভীর শোক প্রকাশ করেন। সামাজিক মাধ্যমেও তাকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দেন অনেকেই।

আবদুস সাদেক ছিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক বিরল প্রতিভা। ফুটবল ও হকি, দুই খেলাতেই তিনি সমান দক্ষতা ও সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। সত্তর-আশির দশকে এক সঙ্গে ফুটবল, হকি দুটোই খেলেছেন। ১৯৭২ সালে আবাহনী ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক সাদেক। বাংলাদেশ হকি অধিনায়কের তালিকাতেও তার নাম প্রথমে। ১৯৭৮ সালে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ হকি দলের ‘আর্মব্যান্ড’ ছিল সাদেকের হাতেই। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদান রাখায় ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন আবদুস সাদেক। শুধু তারকা খেলোয়াড়ই নন, তিনি ছিলেন দক্ষ ক্রীড়া সংগঠকও। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন ঘরোয়া প্রতিযোগিতা শুরু করে এবং ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর ১৯৭৭ সালে জুনিয়র বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ এবং ১৯৭৮ সালের এশিয়ান গেমসে অভিষেক দেশের হকির ইতিহাসে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ের নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত আবদুস সাদেক।

সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের হকিতে প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, ইব্রাহীম সাবের, এহতেশাম সুলতান, খাজা ড্যানিয়েল ও জুম্মন লুসাইয়ের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দেখা মিলেছিল। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুযোগ সীমিত থাকায় অনেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাননি। সেই প্রেক্ষাপটে জাতীয় দলের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে আবদুস সাদেকের অর্জন আরও বেশি তাৎপর্য বহন করে।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি ক্রীড়া সংগঠক ও প্রশাসক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তরুণ খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা, ক্রীড়ার উন্নয়নে কাজ করা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার শৃঙ্খলাবোধ, সততা এবং ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা তাকে সবার কাছে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।

আবদুস সাদেকের মৃত্যুতে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন হারাল একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বকে। তার অবদান কেবল মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের হকি ও ফুটবলের ভিত্তি নির্মাণের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার নাম। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক, আর সমসাময়িকদের কাছে নেতৃত্ব, নিবেদন ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

আবদুস সাদেকের সঙ্গে খেলে নিজেকে সম্মানিত বোধ করতেন সাবেক তারকা ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপু। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বয়সে হয়তো আমার চেয়ে খুব বেশি বড় হতেন না সাদেক ভাই। কিন্তু সম্মানের দিক দিয়ে অনেক বড় ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালে যখন আবাহনী প্রথম ফুটবল দল গঠন করে, সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। আবাহনী ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক হিসোব অনেক সম্মানের ফুটবলার ছিলেন সাদেক ভাই। যদিও পরে তিনি আবাহনী হকি দলেরও প্রথম অধিনায়ক ছিলেন। আমার মনে আছে, কুমিল্লা জেলা দলের হয়ে উনার নেতৃত্বেও খেলেছিলাম আমি।’ তিনি যোগ করেন, ‘ফুটবলারদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্মরণীয় একজন ব্যক্তি। সহ-খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আন্তরিক।’ দেশের ফুটবলের অন্যতম আইকনিক কাজী সালাউদ্দিন। খেলোয়াড় ও সংগঠক দুই ধারাতেই ছিলেন সফল। সহ-খেলোয়াড় হিসেবে প্রয়াত আবদুস সাদেককে নিয়ে তার স্মৃতিচারণ, ‘আমি বেশ গর্ব করেই বলতে পারি, সাদেক ভাই ছিলেন একজন ভদ্র ও ভালোবাসার মানুষ। কখনো আমি তাকে রাগ করতে দেখিনি। একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন। আবাহনী ক্লাবকে নিজের পরিবারের মতোই দেখতেন। আমাদের মতো ছোটদেরও অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন।’ আরেক সহ-খেলোয়াড় আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ‘সাদেক ভাই ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত, স্নেহশীল ও গাইডলাইন দেওয়া একজন নেতা। আবাহনীর কঠিন সময়ে তিনি নিজের বাড়িতে মিটিং করে ক্লাবকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অধিনায়ক ও কোচ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন ভালো অভিভাবক ছিলেন সাদেক ভাই। ভুল করলে শাস্তির বদলে তিনি খেলোয়াড়দের বুঝিয়ে সংশোধন করতেন এবং সবসময় ইতিবাচক উৎসাহ দিতেন।’

হকিতে আবদুস সাদেকের আরেকজন সহ-খেলোয়াড় প্রতাপ শংকর হাজরা বলেন, ‘এখন তো আর কেউ নেই। পিন্টু ভাইয়ের পর খেলেন, আবদুস সাদেক ভাই। একটি প্রজন্মের প্রতীক ছিলেন। সাদেক শুধু একজন অধিনায়কই ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক, যিনি মাঠের ভেতর ও বাইরে তরুণ খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করতেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামো যখন প্রায় অনিশ্চিত অবস্থায় ছিল, তখন আবদুস সাদেকের মতো খেলোয়াড়রা নিজেদের নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দলকে সংগঠিত রাখেন। বিশেষ করে হকি দলে তার নেতৃত্বের সময় শৃঙ্খলা, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং দলগত ঐক্য গড়ে ওঠে। তাই সাদেক ভাইয়ের মতো একজন ক্রীড়াবিদের মৃত্যু নয়, বরং একটি যুগের অবসান।’

একজন পরিমার্জিত ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক হিসেবে আবদুস সাদেককে আখ্যা দিয়ে সাবেক তারকা ফুটবলার আবদুল গাফফার বলেন, ‘খেলোয়াড়ি জীবনে আমি দেখেছি, উনি কখনোই আম্পায়ার বা রেফারির সিদ্ধান্তে কোনোরূপ উষ্মা প্রকাশ করেননি। বরং অন্যরা যখন এমন করত, তখন তিনি দূরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সব সময় হাসিমাখা মুখে কথা বলতেন। কখনো কাউকে অসম্মান করে কথা বলতে দেখিনি। এমন একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকেই আদর্শ মেনে বড় হওয়া উচিত আজকের ক্রীড়াবিদদের। আগামীকাল সাদেক ভাইয়ের দ্বিতীয় জানাজা হবে বনানী ডিওএইচএসে। আমি আবাহনীর সব খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’

আবদুস সাদেকের প্রয়াণে গভীর শোক ও দুঃখপ্রকাশ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এক শোকবার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আবদুস সাদেকের মৃত্যুতে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন এক অনন্য অভিভাবক ও প্রকৃত কিংবদন্তিকে হারাল। তিনি একাধারে ফুটবল ও হকি দুই মাঠেই সমান দ্যুতি ছড়িয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম হকি অধিনায়ক এবং ঐতিহ্যবাহী আবাহনী ক্রীড়া চক্রের ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের ভিত্তিমূলে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। খেলোয়াড়ি জীবনের পর সংগঠক ও প্রশাসক হিসেবেও তিনি ছিলেন তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।’ প্রতিমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়াও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-সহ আরও অনেকে গভীর শোক জানিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত