নিউ জার্সির মেঘলা আকাশ আর অবিরাম বৃষ্টিতে ভেজা মাঠ তখন রূপ নিয়েছে এক টুকরো নরওয়েতে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই পরম আবেগে মাঠের কর্দমাক্ত ঘাসের ওপর আছড়ে পড়লেন নরওয়ের ফুটবলাররা। দীর্ঘ ২৮ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব নিশ্চিত করার আনন্দ আছড়ে পড়ল গ্যালারিতেও। তবে উৎসবের আসল নাটকের তখনও বাকি ছিল। পুরো দল গ্যালারির সামনে গিয়ে বসে পড়ল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সারিবদ্ধ শিশুদের মতো। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ড্রামের কাঠি হাতে তুলে নিতেই শুরু হলো ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন। গ্যালারির হাজারো সমর্থকের তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফুটবলাররা যেন মাঠেই চালাতে লাগলেন এক অদৃশ্য ভাইকিং যুদ্ধজাহাজ (লংবোট)। আর এই মহাকাব্যিক রাতের মহানায়ক আর কেউ নন, আর্লিং ব্রাউট হালান্ড।
নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সেনেগালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ৩২-এর টিকিট কাটল নরওয়ে। আফ্রিকান পরাশক্তি সেনেগালের রক্ষণভাগকে একাই তছনছ করে দিয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির ২৫ বছর বয়সী স্ট্রাইকার হালান্ড। টুর্নামেন্টে এটি তার টানা দ্বিতীয় জোড়া গোল। এই জয়ে প্রথম দুই ম্যাচেই ৪ গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের লড়াইটা জমিয়ে তুললেন এই গোলমেশিন। নরওয়ের জার্সিতে এখন তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২ ম্যাচে ৫৯টি!
ম্যাচের শুরু থেকেই নরওয়ের গতি ও কৌশলের সামনে বেশ কোণঠাসা ছিল সেনেগাল। তবে প্রথমার্ধের শেষভাগে আফ্রিকান দলটির অধিনায়ক কালিদু কুলিবালির এক মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে নরওয়েকে এগিয়ে দেন বদলি ডিফেন্ডার মার্কাস পেডারসেন। বিরতির ঠিক তিন মিনিট পর দেখা মেলে ম্যাচের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মুহূর্তের। ওডেগার্ডের বাড়ানো এক জাদুকরী পাস ধরে সেনেগালের ডিফেন্স চিরে বল জালে জড়ান হালান্ড।
সেনেগালের হয়ে ইসমাইলা সার একটি গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও কুলিবালির আরেকটি ভুল ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে দারুণ ভলিতে নরওয়ের পক্ষে নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোলটি করেন হালান্ড। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে সার আরও একটি গোল করে সেনেগাল শিবিরে আশা জাগালেও নরওয়ের জয়রথ থামাতে পারেননি। এই জোড়া গোলের মাধ্যমে সার সেনেগালের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড গড়েন।
ম্যাচ শেষে ভাইরাল হওয়া ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন নিয়ে রোমাঞ্চিত হালান্ড বলেন, “আমি এটা অনলাইনে দেখেছিলাম, এটি পুরোপুরি ভাইরাল হয়েছে। ম্যাচের আগে ওডেগার্ড আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমরা কি এটা করব? আমি বলেছিলাম, যদি জিতি তবে কেন নয়!”
তবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের ব্যাপারে বাস্তববাদী হালান্ড আরও যোগ করেন, “২৮ বছর পর বিশ্বক”পে এসে গ্রুপ পর্ব পার হওয়া আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন। কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার চিন্তাটা এখনই বাস্তবসম্মত নয়।”
এই জয়ের ফলে গ্রুপ আই থেকে ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করল নরওয়ে। আগামী ২৭ জুন বোস্টনে গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে ফরাসিদের মুখোমুখি হবে তারা। অন্যদিকে টানা দুই হারে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় থাকা সেনেগালকে এখন তাকিয়ে থাকতে হবে ইরাকের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের দিকে।