স্ক্রিন টাইমে শিশুদের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে: গবেষণা

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:২১ এএম

দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়মিত স্ক্রিন ব্যবহার তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, স্মার্টফোন, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস এই বয়সে ব্যবহারের ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই বয়সে স্ক্রিন টাইম পুরোপুরি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বর্তমানে বড়দের পাশাপাশি কিশোরদের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে আলোচনা হলেও একদম ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে একটি বড় 'শূন্যতা' বা 'বেবি ব্লাইন্ড স্পট' তৈরি হয়েছে, যা নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

অভিভাবকদের অজান্তেই প্রভাব ফেলছে স্ক্রিন অভ্যাস

ইউনিভার্সিটি অব লিডস-এর মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এবং গবেষণার সহ-নেতা রেফ ক্লেটন বলেন, অভিভাবকদের পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা না থাকায় তারা অজান্তেই শিশুদের স্ক্রিনের প্রতি অস্বাস্থ্যকর নির্ভরতা গড়ে তুলছেন। তার ভাষায়, এটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

বিস্তৃত গবেষণা পর্যালোচনায় উঠে এল উদ্বেগ

গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে এবং এটিকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি নির্দেশিকায় যদিও দুই বছরের কম বয়সীদের স্ক্রিন এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে 'শেয়ার্ড স্ক্রিন টাইম' বা যৌথ ব্যবহারের কথা উল্লেখ থাকায় তা অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

সম্ভাব্য ক্ষতির দিকগুলো

গবেষণায় একাধিক সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- বাবা-মা ও শিশুর মধ্যে আবেগগত বন্ধন দুর্বল হওয়া। খেলাধুলা ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সময় কমে যাওয়া। ভাষা শেখা ও বিকাশে বাধা। ঘুমের সমস্যা ও অতিরিক্ত উত্তেজনা। চোখের স্বাস্থ্যঝুঁকি। শৈশবে স্থূলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি। শিশুর শান্ত হওয়ার জন্য অভিভাবকের বদলে ডিভাইসের ওপর নির্ভরতা।

তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এসব সমস্যার সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তারপরও ঝুঁকি উপেক্ষা করা উচিত নয় বলে তারা মত দিয়েছেন।

নতুন সুপারিশ ও নীতিগত আহ্বান

গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দুই বছরের কম বয়সীদের জন্য কোনো ধরনের নিয়মিত বা উদ্দেশ্যমূলক স্ক্রিন টাইম থাকা উচিত নয়। এমনকি সীমিত ব্যবহারের কথাও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গবেষকরা একটি 'বেবি স্ক্রিন-টাইম রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট' চালুর আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে আগেভাগে সহায়তা দেওয়া যায়।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব লিডস, লিডস ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি, লাফবরো ইউনিভার্সিটি এবং অ্যাস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সমন্বয়ে।

বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া

লিডস ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও গবেষণার সহ-নেতা কারমেন ক্লেটন বলেন, অভিভাবকদের সঙ্গে আরও কার্যকর যোগাযোগ জরুরি, তবে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ বা বিচারভীতিও সৃষ্টি করা উচিত নয়।

অন্যদিকে ওয়ান থাউজ্যান্ড ওয়ান ক্রিটিক্যাল ডেজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রিয়া লিডসম বলেন, শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার এক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে স্ক্রিন ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

তিনি অভিভাবকদের এককভাবে দায়ী না করে পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন।

যুক্তরাজ্যের শিশু কমিশনার র‍্যাচেল দে সুজা বলেন, সরকারি নির্দেশনার উদ্দেশ্য অভিভাবকদের সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং সহায়তা করা। সীমিত কিছু ক্ষেত্রে যেমন ভিডিও কল বা সহায়ক শিক্ষা, সেখানে অল্প স্ক্রিন ব্যবহার স্বাভাবিক হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে শিক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, তারা পাঁচ বছরের কম বয়সীদের জন্য স্ক্রিন টাইম নির্দেশিকা প্রকাশ করে পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত