বিনা নোটিসে অফিসে তালা দিয়ে আসবাবপত্র বাইরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। পৌরসভাগুলোর সংগঠন ম্যাবের ভাড়া অফিস নিয়ে প্রকৌশলীর এমন কা-ে বিব্রত কর্মকর্তারা। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুজ্জামান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ৩৩০টি পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর ও কর্মকর্তাদের সংগঠন মিউনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ম্যাব)। পৌরসভার একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত স্থানীয় সরকারের অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে পৌরসভার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি, দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গঠনে সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
এলজিইডির ঢাকা অফিসের দশম তলায় ফ্লোর ভাড়া নিয়ে ম্যাব কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। চুক্তি অনুযায়ী ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক বিল পরিশোধ করত সংগঠনটি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর মেয়র-কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে কিছু ভাড়া বকেয়া পড়ে। সংগঠনকে গতিশীল করতে পৌরসভার সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়ে অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করে সংগঠনটি। ওই কমিটির পক্ষ থেকে গত ১০ মে নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর চুক্তি নবায়ন এবং বকেয়া ভাড়া দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়।
ম্যাবের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বকেয়া পরিশোধ এবং চুক্তি নবায়নের আবেদনের পর এলজিইডি থেকে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। এরপর গত ১৯ এবং ২০ জুন তাদের অফিসের মালামাল বাইরে বের করে নতুন তালা দিয়ে দেওয়া হয়।
এ সময় ম্যাবের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। সারা দেশের পৌরসভাগুলোর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইলপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি অফিসের ভেতরে ছিল। ২৫ জুন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ম্যাবের অফিসের দরজায় টাঙিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল রবিবার সরেজমিনে গিয়ে সেই চিঠি পাওয়া যায়নি। ম্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হওয়ার পর এলজিইডির লোকজন চিঠি সরিয়ে নিয়েছে।
ওই চিঠিতে দেখা গেছে, গত ১৪ জুন ম্যাবের নির্বাহী সভাপতি বরাবর লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিস ভবনের দশম তলায় ১ হাজার ৪৩২ দশমিক ৭০ বর্গফুট জায়গায় অফিস স্পেস গত ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভাড়ায় ব্যবহারের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় সূত্রস্থ স্মারকসমূহের মাধ্যমে এলজিইডির নিজস্ব প্রয়োজনে উক্ত অফিস স্পেস হস্তান্তর করার জন্য বারবার তাগিদপত্র প্রদান করা সত্ত্বেও হস্তান্তর করেনি। ফলে অফিস স্পেসের অভাবে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দাপ্তরিক কাজে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
এই ভবনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, ঢাকা বিভাগ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ঢাকা অঞ্চল ও প্রায় ১৮টি প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং জায়গার সংকুলান না থাকায় উক্ত দশম তলার জায়গাটি এলজিইডির বিশেষ প্রয়োজন হওয়ায় বরাদ্দ/চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় এলজিইডির দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজনে উল্লেখিত অফিস স্পেস আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
চিঠির শেষাংশে বলা হয়, যেহেতু ইতিপূর্বে একাধিকবার বলা হলেও জায়গা খালি করছেন না, সেহেতু আগামী ৩০ জুনের মধ্যে জায়গা বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে সরকারি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে উক্ত জায়গা এলজিইডি কর্তৃক ব্যবহার শুরু করা হবে।
তবে ৩০ জুনের আগেই অফিসে তালা দেওয়ায় বেকায়দায় পড়েছে ম্যাব। এ নিয়ে সরকারের একাধিক দপ্তরেও যোগাযোগ করেছেন কর্মকর্তারা। গত ২৩ ও ২৮ জুন নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর দুটি চিঠি দিয়েছে ম্যাব।
এসব চিঠিতে ম্যাব অফিসের আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ফটোকপিয়ার, এসি-সহ গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র জবরদস্তিমূলক বের করে ফেলা এবং বিনা নোটিসে অবৈধভাবে অফিস দখলের অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, পত্রের বিপরীতে ভাড়া পরিশোধের চাহিদাপত্র না দিয়ে বিনা নোটিসে বিগত ১৯/২০ জুন সরকারি বন্ধ থাকাকালীন ম্যাব অফিস অবৈধভাবে দখল করে। যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত এবং ভাড়াটিয়া ও মালিকের সঙ্গে চুক্তির লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের আইনে দ-নীয় অপরাধ।
সব ধরনের আইনি জটিলতা এড়িয়ে ম্যাব অফিসের কার্যক্রম সচল রাখতে স্থানান্তরিত আসবাবপত্র ও মালামাল যথাস্থানে বসিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করে ম্যাব।
অভিযোগ অস্বীকার করে এলজিইডির ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের কেউ তালা দেয়নি। বিভিন্ন প্রকল্পসহ নানা কাজে আমাদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। তাই তাদেরকে অফিস ছাড়তে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। শুধু শুধু সরকারি অফিস দখল করে রেখেছে। গত সরকারের আমলে চুক্তি ছিল। সেই চুক্তি আমরা রাখতে চাই না।
ম্যাবের অন্তর্বর্তী কমিটির প্রেসিডেন্ট জসীম উদ্দীন আরজু বলেন, তারা আমাদের অফিস দিতে না চাইলে আলোচনার মাধ্যমে একটা সুরাহা করা যেত। এভাবে কাউকে না বলে ফাইলপত্র ও আসবাব ছুড়ে ফেলা অশোভন ও বেআইনি। একই বিল্ডিংয়ে অফিস তারা চাইলে নোটিস অফিসে দিতে পারত। এভাবে তালা দিয়ে নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়ায় আমরা বিব্রত।
তিনি বলেন, ম্যাব স্থানীয় সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পৌরসভার উন্নয়ন সহযোগী। এসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থপনা ও পরিবেশ উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলছে। পৌরসভাগুলোতে নির্বাচিত মেয়র এলে তাদের নেতৃত্বে আরও ম্যাবের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।