আনচেলত্তির ‘শান্ত’ মস্তিস্কে ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। গ্যালারি ও বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের বুকে তখন প্রথমবার শেষ ষোলোর আগেই বিদায় নেওয়ার চরম আতঙ্ক। কিন্তু ড্রেসিংরুমে বসা মানুষটির কপালে কোনো চিন্তার ভাঁজ নেই। তিনি কার্লো আনচেলত্তি—ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা চাণক্য, যিনি খাদের কিনারে দাঁড়িয়েও শান্ত থাকতে জানেন।

প্রথমার্ধ শেষে বিরতিতে ড্রেসিংরুমে ফিরে শিষ্যদের প্যানিক না হয়ে শুধু ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিলেন। ইতালিয়ান এই কোচের সেই জাদুকরী শান্ত মানসিকতাই যেন খেই হারিয়ে ফেলা সেলেসাওদের ভেতর এক নতুন বিশ্বাসের জন্ম দিল। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের ফুটবলে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে দুর্দান্ত এক জয়ে জাপানের প্রতিরোধ ভেঙে শেষ ষোলোর টিকিট কাটল ব্রাজিল।

২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত জয়ের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতল সাম্বা বয়রা। অথচ হিউস্টন স্টেডিয়ামের এই ম্যাচের প্রথমার্ধের গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাইশু সানোর গোলে এগিয়ে গিয়ে ৫-৪-১ ফরমেশনে এক নিটোল রক্ষণাত্মক দুর্গ গড়ে তুলেছিল হাজিমে মোরিয়াসুর জাপান। মাঝমাঠ পুরো বোতলবন্দী করে ফেলায় প্রথমার্ধে কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারছিল না ব্রাজিল।

কিন্তু বিরতিতে অভিজ্ঞ আনচেলত্তি খেললেন তার আসল চাল। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার জায়গায় মাঠে নামালেন তরুণ এনদ্রিককে এবং উইং ধরে রায়ান ও ভিনিকে বক্সে বেশি করে ক্রস দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ট্যাকটিক্যাল এই বদলের চেয়েও বড় ছিল খেলোয়াড়দের মানসিকতার পরিবর্তন। ১৪ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখা সত্ত্বেও অভিজ্ঞ ক্যাসেমিরোকে মাঠ থেকে তুলে নেননি আনচেলত্তি, যা ছিল কোচের অগাধ বিশ্বাসের প্রমাণ। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে ৫৬ মিনিটে দারুণ এক হেডে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডার।

ম্যাচের নাটকীয়তা তখনো বাকি ছিল। নির্ধারিত সময় শেষে ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমে ব্রাজিলের ডাগআউটকে উৎসবে ভাসিয়ে জয়সূচক গোলটি করেন বদলি হিসেবে নামা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। গোলটি হওয়ার পর ব্রাজিলের পুরো বেঞ্চ যখন উন্মাতাল উল্লাসে মাঠের ভেতর ছুটে যাচ্ছে, ডাগআউটে দাঁড়ানো ৬৬ বছর বয়সী আনচেলত্তি তখনো যেন এক শান্ত প্রতিমূর্তি!

ম্যাচ শেষে জয়ের নায়ক মার্তিনেল্লি কোচের এই অদ্ভুত শান্ত স্বভাবের প্রশংসা করে বলেন, “আনচেলত্তি আসলেই এক অবিশ্বাস্য মানুষ। বিরতির সময় তিনি আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলেন যে আমরা গোল করবই। গোল কখন আসবে সেটা বড় কথা ছিল না, তার সেই শান্ত রূপটাই আমাদের মাঠের চাপ দূর করে দিয়েছিল।”

নিজের অনুভূতি জানিয়ে কুল-ডাউন আনচেলত্তি বলেন, “ফুটবলে কষ্ট পাওয়া বা চাপ নেওয়াটা খুব স্বাভাবিক। প্রথমার্ধে জাপান আমাদের জায়গা দেয়নি, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আমরা ধৈর্য ধরে আমাদের কাঠামো বজায় রেখেছি। এটাই আমাদের খেলা সেরা সবচেয়ে গোছানো ম্যাচ।”

অন্যদিকে বীরোচিত লড়াইয়ের পর জাপানি কোচ মোরিয়াসুও স্বীকার করেছেন, ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিদের সাথে তাঁদের ব্যবধান এখন অনেক কমে এসেছে। ২৪ বছরের বিশ্বকাপ খরা কাটানোর মিশনে শান্ত মাথার এক কাপ্তানকে পেয়ে ব্রাজিলিয়ান ভক্তরা এখন হেক্সা জয়ের স্বপ্ন নতুন করে বুনতেই পারেন।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত